,

ডিমের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর দাপট, জিম্মি খামারি-ভোক্তা

news-image

নিজস্ব প্রতিবেদক : এখন খুচরা বাজার থেকে একটি ডিম ১৩ টাকারও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের, যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ডিম উৎপাদনে খামারির খরচ হয়েছে ১০ টাকা ২৫ পয়সা।

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সারা দেশের খামার থেকে আড়তদার ডিম কিনেছে ১১ টাকা ১১ পয়সায়। অর্থাৎ প্রতিটি ডিমে প্রায় দুই টাকার দামের ফারাক, যেখানে খামারি ডিম উৎপাদন করে মুনাফা পেয়েছেন এক টাকারও কম।

তথ্য বলছে, কয়েক হাত ঘুরে ডিম যখন শহরের দোকানে পৌঁছায়, তখন দাম বেড়ে যায় কয়েক টাকা। অথচ এ বাড়তি দামের পুরোটা খামারির ঘরে পৌঁছায় না। বরং মাঝে মাঝে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ডিম বিক্রি করে লোকসান গুনতে হয় তাদের।

দেশের ডিমের বাজারের এ বৈপরীত্য এখন প্রকট। উৎপাদন খরচ বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খামারির বিক্রয়মূল্য বাড়ছে না। আবার খামার থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর পথে মধ্যস্বত্বভোগীদের কয়েকটি স্তরে যোগ হওয়ায় খুচরা বাজারে ডিমের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আর ভোক্তাকে দিতে হচ্ছে এ বাড়তি দাম।

ডিমের উৎপাদন কত, মধ্যস্বত্বভোগীদের ভাগ কত?
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত এক দশকে দেশে ডিমের উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ শতাংশের বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদিত হয়েছিল এক হাজার ৪৯৩ কোটি পিস। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৫০৯ কোটি পিসে।

অর্থাৎ, এখন প্রতিদিন দেশে ৬ কোটি পিসের বেশি ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ আসে প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে। আর প্রতি ডিমে দুই টাকা করে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে গেলে, প্রতিদিন তাদের কাছে যায় প্রায় ১২ কোটি টাকা।

খামারিদের লাভ-ক্ষতি
উৎপাদনের এ বড় অংশ জোগান দেওয়া প্রান্তিক খামারিদের অবস্থাই অবশ্য সবচেয়ে নাজুক। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খামারির খরচ পড়ছে অন্তত ১০ টাকা ২৫ পয়সা। এখন ডিমের দাম সর্বোচ্চ হওয়ায় তারা কিছুটা লাভ পেলেও অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের।

যা বলছেন খামারিরা
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার একজন খামারি নুরুল হক বলেন, বছরের অধিকাংশ সময়ই খামারিরা লোকসানে থাকছেন। যখন লাভ হচ্ছে, তখন সেটি সামান্য, কিন্তু লোকসান হলে তা ধস নামিয়ে দেয়। যে কারণে দেশের বহু প্রান্তিক খামার বন্ধ হয়ে গেছে।

দেশে ডিমের বাজারে অরাজকতার সবচেয়ে বড় কারণ মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিমুনাফার প্রবণতা বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার। তিনি বলেন, প্রান্তিক খামারি ডিম ও মুরগি উৎপাদন করেন, কিন্তু দাম নির্ধারণ করতে পারেন না। দাম নির্ধারণ করে কিছু ডিম ব্যবসায়ী সমিতি, যারা মূলত মধ্যস্বত্বভোগী। তাদের সুবিধামতো প্রতিদিন দেশের সব আড়তে মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে যে দাম নির্ধারণ করা হয়, সে দামেই প্রান্তিক খামারিদের ডিম বিক্রি করতে হয়- উৎপাদন কম হোক বা বেশি।

তিনি আরও বলেন, তারা বাজারে সিন্ডিকেট করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে নিলেও তাদের শাস্তি না হওয়ায় বাজারে অস্থিরতা বেড়েই চলছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, খামার থেকে বাজারে আসার পথে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ডিমের দামে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এসব মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিটি ডিমে দুই টাকা বা তারও বেশি নিয়ে থাকেন।

মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, ভোক্তাদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে, খামারিরাই ডিমের দাম বাড়াচ্ছেন। আসলে খামারিরা বাজারের দাম ঠিক করতে পারেন না। খামার থেকে বাজার পর্যন্ত মাঝখানে যারা থাকেন, তাদের কারণেই মূলত দামের ব্যবধান তৈরি হয়।

ডিম কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ
তারমতে, খামারিদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার মতো সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করা গেলে এই ব্যবধান অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে পোলট্রি খাদ্যের দাম কমানোর উদ্যোগও প্রয়োজন। কারণ পোলট্রি শিল্পের মোট খরচের অর্ধেকের বেশি ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে।

উৎপাদন খরচও বড় সমস্যা
এদিকে মুনাফা সামান্য হলেও দিন দিন বাড়ছে খামারিদের ডিম উৎপাদন খরচ। উৎপাদন খরচ বাড়ার চিত্রটি পাওয়া যায় বগুড়ার খামারি হাফিজুর রহমানের কথায়। তিনি বলেন, গত ২০ থেকে ২৫ দিনে বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ খাবারের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। ব্রানের দাম ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৮০০ টাকা। আর ভুট্টার দাম কেজিতে ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৭ টাকা হয়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা পোলট্রি ফিডের দাম এখন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬৭৫ টাকা।

হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ফিডসহ সবকিছুর দাম বাড়ছে। কিন্তু ডিমের দাম আমরা ঠিক করতে পারি না। উৎপাদন খরচের কমেও অনেক সময় ডিম বিক্রি করতে হয়।

এটি নতুন কোনো সংকট নয়। বর্তমানে বাজারে ডিমের দাম বেশি থাকলেও মাঝে মধ্যে দাম একদম কমে যায়। তখন টানা লোকসানে পড়তে হয় খামারিদের। একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় দেশে কয়েকশ খামার।

গত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উৎপাদন খরচের নিচে ডিম বিক্রির প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খামারিরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ডিম ভেঙে প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি দিয়েছেন। রাজশাহী, গাজীপুর, পাবনা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদী, ঢাকা, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে এসব কর্মসূচি হয়। ওই সময়ে অনেক খামারি প্রতিটি ডিম ৮ থেকে ৯ টাকায় বিক্রি করেন।

ঊর্ধ্বগতি হলে ব্যবস্থা, লোকসানে নিশ্চুপ
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) আহ্বায়ক মশিউর রহমান বলেন, খামারিরা বছরের বেশির ভাগ সময়ই উৎপাদন খরচ তুলতে পারেন না। অথচ ডিমের দাম বেড়ে গেলে সরকার সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে। দাম পড়ে গেলে খামারিদের রক্ষায় সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা হয় না।

তার প্রশ্ন, সরকারের হিসাবে যখন উৎপাদন খরচের তথ্য থাকে, তখন খামারির ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সর্বনিম্ন দাম কেন নির্ধারণ করা হবে না?

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে ডিমের দাম কমে গেলে তার সুফল ভোক্তা পান, কিন্তু লোকসানের পুরো চাপ পড়ে খামারির ওপর। আবার দাম বেড়ে গেলে খামারি পর্যায়ে সেই বাড়তি দামের পুরোটা পৌঁছায় না। ফলে দুই অবস্থায়ই খামারি সংকটে থাকেন।

তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত লেয়ার খামারের সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে নিবন্ধিত খামার রয়েছে ২০ হাজার ৪৬৪টি। এসব খামারির বড় অংশই প্রান্তিক পর্যায়ের। তাদের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করেই দেশের ডিমের বাজার সচল রয়েছে। অদ্ভুত বিষয় হলো, লোকসান হলেও খামারিরা উৎপাদন বন্ধ করতে পারেন না। ডিম দেওয়ার উপযোগী মুরগি তৈরি করতে দীর্ঘ সময় ও বড় বিনিয়োগ লাগে। ফলে বাজারদর কমে গেলেও খামার চালিয়ে যেতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়, কখন দাম বাড়বে।

মাথাপিছু এখন ১৪০ ডিম
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে বর্তমানে মাথাপিছু বছরে ১৪০টির বেশি ডিমের সরবরাহ রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মানদণ্ড অনুযায়ী একজন সুস্থ মানুষের বছরে অন্তত ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু ডিমের উৎপাদন ২০০টিতে নেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের।

এ জাতীয় আরও খবর

অটোরিকশা নিয়ে নতুন পরিকল্পনা, কতটা কার্যকর হবে?

বিয়ের জন্য যেমন ছেলে চান মিমি

ঢাকায় দিনের তাপমাত্রা কমতে পারে

সবজির বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব

দেশের বাজারে বাড়ল স্বর্ণের দাম

আফগানিস্তানের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ

সবুজ সংকেত রূপপুরে, প্রতিকূলতা পেরিয়ে জ্বলল আশার আলো

বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয়েছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাহদীকে

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ‘অবশ্যই সম্ভব’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আমরা ভারতবিরোধী না: আসিফ মাহমুদ

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে সাফল্য এখন অতীত, শান্তদের পরিকল্পনা আফগানদের নিয়ে

নানার চলে যাওয়ায় কাঁদছে বলিউড, তনুশ্রী বললেন ‘শয়তানের মৃত্যু’