নানা পাটেকর যেন অঘোষিত ‘মিম কিং’
সিনে পর্দায় যেমন তার উজ্জ্বল উপস্থিতি, সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন কনটেন্টেও দেখা যেতো তার চেহারা। অনেকে তাকে নামে না চিনলেও নেটিজেনদের প্রিয়মুখ তিনি। উপরোক্ত চেহারা-দৃশ্যগুলো নিশ্চয়ই অচেনা লাগছে না!
ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করতে করতে হারহমেশাই চলে আসে এই দৃশ্যগুলো। ফানি কনটেন্ট কিংবা মিম-এর জন্যই বেশি ব্যবহার হয় এসব কাটপিস। মোবাইল ফোনে যার চেহারা দেখে আনন্দিত হয় নেটিজেনরা, তিনি আর কেউ নন, ভারতের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা নানা পাটেকর। কিন্তু, সিনেপ্রেমী ও তার ভক্তকূলের হাসি থামিয়ে বৃহস্পতিবার ভোরে চিরতরে বিদায় নিয়েছেন এই অভিনেতা।
তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকে স্তব্ধ তার ভক্তরা। অভিনেতার সেই ভাইরাল, জনপ্রিয় মজার চরিত্র ও দৃশ্য স্মরণ করতে থাকেন তারা, হাসির রোল ফেলে দেওয়া সেই মানুষটি যে আর তাদের মাঝে নেই, সেটি ভেবেও মজার দৃশ্যগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে, কেউ করছেন আক্ষেপ।
জীবদ্দশায় অসংখ্য সিনেমা দিয়ে অভিনয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন নানা পাটেকর। পাশাপাশি কমেডি সিনেমায় উল্লেখযোগ্য কিছু চরিত্র ও অভিনয় দিয়ে দর্শকের মনে রাজত্ব করছেন বহু বছর ধরে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ‘ওয়েলকাম’ চলচ্চিত্রের তার উদয় শেঠি চরিত্র। তার এ চরিত্রটি বেশ কিছু আইকনিক মুহূর্ত তৈরি করেছিল পর্দায়; যেটা পরে সামাজিক মাধ্যমের ফানি কনটেন্টের গুরুত্বপূর্ণ রসদে পরিণত হয়। এমনই একটি দৃশ্য হলো, সিনেমায় চা খেতে খেতে হেসে দেওয়া।
একই সিনেমার ‘যা পুচকে আ’ সংলাপটি বেশ সাড়া ফেলেছিল। এটি দিয়েও সামাজিক মাধ্যমে নানা মিম টেমপ্লেট তৈরি করা হয়েছে। যেখানে দেখা যায়, তার এক সহকারী খুব উচ্ছ্বাস নিয়ে একটি প্রশ্ন করে। তখন উদয় তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ইয়ট থেকে পানিতে ছুঁড়ে ফেলে। সঙ্গে বলে, ‘যা পুছকে আ’।
এই সিনেমার আরও একটি জনপ্রিয় দৃশ্যে দেখা যায়, নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় হাত মুষ্টিবদ্ধ করে উদয় বলছে, ‘কন্ট্রোল উদয় কন্ট্রোল’; এটি দিয়েও অসংখ্য মিম তৈরি করা হয় নিয়মিত।
এছাড়াও, একই সিনেমায় তার আলু বিক্রির দৃশ্য (আলু লে লো) বেশ জনপ্রিয়তা পায়। ইউটিউবে কাটপিস করে এই ভিডিওগুলো আলাদা করে রাখেন অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর। বিভিন্ন কনটেন্টে প্রসঙ্গক্রমে এগুলোকে ব্যবহার করে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে নেন তারা।
নানা পাটেকরের অন্যতম কালজয়ী সিনেমা ‘ক্রান্তিবীর’। যেখানে তাকে এক ক্ষ্যাপাটে যুবকের ভূমিকায় দেখা যায়। একটি দৃশ্যে তাকে একটি মাচায় শুয়ে শুয়ে হাসতে দেখা যায়। সেই হাসি হয়ে উঠেছে আইকনিক। এখনকার বহু মিমে সেই হাসি হয়ে গেছে অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মাচায় শুয়ে হাসছেন নানা পাটেকর
বহুদিন কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না কিংবা অনেকদিন পর স্ত্রী গেছে তার বাপের বাড়ি, সেই আনন্দের প্রতিরূপ বোঝাতে ব্যবহৃত হয় নানা পাটেকর অভিনীত এক দৃশ্য। যেখানে দেখা যায়, তিনি সমুদ্র সৈকতে বিপুল আনন্দ নিয়ে ছুটছেন। দৃশ্যটি তার ‘খামোশি’ সিনেমার।
এখানেই শেষ নয়। ‘ওয়াজুদ’ সিনেমার দৃশ্যে দেখা যায়, স্যান্ডো গেঞ্জি, শর্টপ্যান্ট আর কাঁধে গামছা পরে ঘরের কাজ করছেন নানা পাটেকর। ঘর ঝাড়ু দেওয়া, রান্না, সব একাই করছেন তিনি। এই দৃশ্য নিয়েও হয়েছে অসংখ্য মিম। একা কিংবা ব্যাচেলর জীবনযাপনের প্রতীকী অর্থ বোঝাতে দৃশ্যটির ব্যবহার দেখা যায় মিম-কনটেন্টে।
এত এত মিম বলিউড কিংবা উপমহাদেশের আর কোনো অভিনেতাকে নিয়ে দেখা যায় না। ফলে এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তাকে ‘মিম কিং’ বলাই যায়। যদিও তার অভিনয়ের পরিধি এসব হাস্যরসের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর। অমিতাভ বচ্চন পরবর্তী বলিউডের ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ হয়ে ওঠা এই তারকা সমাজ ও দেশের নানা অসঙ্গতির প্রতিবাদী কণ্ঠ ছিলেন সিনেমার পর্দায়। সেসব সিরিয়াস চরিত্রের ভিড়ে কমিক ভূমিকায়ও তিনি যে অনন্য, বারবার তা প্রমাণ করেছেন অভিনেতা।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে গোয়ার মনিপাল হাসপাতালে মারা গেছেন নানা পাটেকর। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে চিকিৎসকরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাকে সিপিআর দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা চালান; তবে সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। পরে ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। এর মধ্য দিয়ে ইতি ঘটে বলিউডের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের।











