গুমের আগে যেভাবে ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ
অনলাইন ডেস্ক : ২০১৫ সালে গুমের শিকার হওয়ার আগে বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে আত্মগোপনে থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিলেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ঢাকার উত্তরার একটি ফ্ল্যাট থেকে তাকে তুলে নেওয়ার ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন ওই ফ্ল্যাটের মালিক ও তার ঘনিষ্ঠজন সৈয়দ হাবিব হাসনাত।
২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর ৬২ দিন তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে ভারতের মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে তার সন্ধান মেলে।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে পুরোনো সেই ঘটনা আবারও আলোচনায় এসেছে। দিবসটি ২০১১ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ভিকটিম ফার্স্ট, অ্যাকশন নাও’।
সৈয়দ হাবিব হাসনাত জানান, বিএনপির মুখপাত্রের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই সালাহউদ্দিনকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছিল। এ কারণে তিনি গুলশানের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে অবস্থান পরিবর্তন করে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
একপর্যায়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানতে পারে, তিনি গুলশান এলাকায় রয়েছেন। তবে ঠিক কোন বাসা বা ফ্ল্যাটে অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি। পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত এলাকা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন সালাহউদ্দিন।
হাবিব হাসনাত বলেন, একদিন দুপুরে সালাহউদ্দিন তাকে ফোন করে গুলশান থেকে দ্রুত সরে যাওয়ার কথা জানান এবং তার উত্তরার ফ্ল্যাটে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে তিনি নিজেই গাড়ি নিয়ে গুলশানে গিয়ে সালাহউদ্দিন ও বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়ালকে নিয়ে উত্তরায় যান।
নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চালককে বিষয়টি জানতে না দিয়ে হাবিব নিজেই গাড়ি চালান। পুলিশের চেকপোস্ট এড়াতে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে তারা উত্তরার ফ্ল্যাটে পৌঁছান। সেখানে আগে থেকেই বাবুর্চি ও একজন সহকারীকে রাখা হয়েছিল।
এরপর ওই ফ্ল্যাট থেকেই সালাহউদ্দিন দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে বিভিন্ন বিবৃতি ও ভিডিও বার্তা পাঠাতে থাকেন। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাকে খুঁজছিল।
হাবিব হাসনাতের ভাষ্য অনুযায়ী, ১০ মার্চ সন্ধ্যার পর উত্তরায় গিয়ে তিনি এলাকার পরিবেশে অস্বাভাবিকতা দেখতে পান। কয়েকটি সড়কের বাতি বন্ধ ছিল, দোকানপাটও ছিল বন্ধ। আশপাশে মানুষের উপস্থিতিও ছিল কম। ফ্ল্যাটের কাছাকাছি গিয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দেখতে পান।
ফ্ল্যাটে গিয়ে তিনি দেখতে পান দরজা ভাঙা। ভেতরে থাকা বাবুর্চি ও সহকারী কান্নায় ভেঙে পড়ে তাকে জানান, ‘মেহমানকে তুলে নিয়ে গেছে।’
ঘটনাটি জানার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়েও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন হাবিব। তার আশঙ্কা হয়, তিনিও গুমের শিকার হতে পারেন। পরে স্ত্রীকে নিয়ে দ্রুত দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। সহযোগীদের মাধ্যমে টিকিটের ব্যবস্থা করে তিনি দেশের বাইরে চলে যান।
হাবিব জানান, বিদেশে যাওয়ার পরও তিনি সালাহউদ্দিনের পরিবারের সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে সালাহউদ্দিনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নেয়নি বলে দাবি করা হয় এবং তিনি আত্মগোপনে গেছেন—এমন বক্তব্যও দেওয়া হয়।
একপর্যায়ে তাকে বিদেশে সংবাদ সম্মেলন করে সালাহউদ্দিনকে উত্তরার ফ্ল্যাট থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনা প্রকাশ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলে জানান হাবিব। কিন্তু এর আগেই গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে তাকে চুপ থাকার হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি দেশে ফিরলে সমস্যায় পড়ার পাশাপাশি প্রাণনাশের আশঙ্কার কথাও তাকে জানানো হয়েছিল বলে তার দাবি।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় জানা যায়, সালাহউদ্দিনকে তুলে নেওয়ার কয়েক দিন আগে ৭ মার্চ তার দুই চালক শফিক ও খোকন এবং ব্যক্তিগত সহকারী ওসমান গণিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরদিন ৮ মার্চ তার সন্ধানে গুলশানের একটি ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানো হয়।
এরপর ১০ মার্চ উত্তরার ফ্ল্যাট থেকে সালাহউদ্দিনকে তুলে নেওয়া হয়। তার গুলশানের অবস্থানস্থলেও একাধিকবার তল্লাশি চালানো এবং সেখানে গোয়েন্দা নজরদারি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।
সে সময় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও প্রকাশিত হয়। তাদের ভাষ্য ছিল, সালাহউদ্দিনকে তুলে নেওয়ার আগে ওই এলাকার কাছাকাছি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি দেখা গিয়েছিল। পরে অস্ত্রধারীরা তাকে জোর করে নিয়ে যায় বলে নিরাপত্তাকর্মীদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
তবে ঘটনার সময় তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সালাহউদ্দিনের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। তাকে আত্মগোপনে থাকার সঙ্গে যুক্ত করে বিভিন্ন বক্তব্যও দেওয়া হয়।
দীর্ঘ ৬২ দিন নিখোঁজ থাকার পর ভারতের মেঘালয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় সালাহউদ্দিনের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর তাকে নিয়ে গুমের অভিযোগটি আরও ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।











