‘আয়নাঘর’ আর থাকবে না স্বাধীন বাংলাদেশে: রাষ্ট্রপতি
অনলাইন ডেস্ক : স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়না ঘর’ থাকবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে গুমের সঙ্গে জড়িতদের ক্ষমতার প্রভাব বিবেচনা না করে বিচারের আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
রোববার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এটি শুধু একটি সাধারণ অপরাধ নয়, বরং মানবতাবিরোধী ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। একজন মানুষকে গুম করার পাশাপাশি তার পরিবারকেও দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা, মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, সংবিধান নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনি সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করেছে। গুম ও হত্যার মাধ্যমে এসব মৌলিক অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘিত হয়।
গত দেড় দশকে গুম এবং গোপন বন্দিশালা ‘আয়না ঘর’-এর ভয়াবহতার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ভিন্নমত প্রকাশ, প্রতিবাদ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত অনেক মানুষকে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে। তাদের অনেককে গোপনে হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি গুমের শিকার বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অনেকের কথা স্মরণ করেন। তাদের স্বজনরা এখনো প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এ ছাড়া আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দীর্ঘদিন গোপন বন্দিশালায় আটকে থাকার কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের গুমের ঘটনাটিও তিনি উল্লেখ করেন।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ বা মৃত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গুম প্রতিরোধে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে এবং এ ধরনের ঘটনা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে।
রাষ্ট্রপতি আরও জানান, গুম ও গণহত্যার অভিযোগের বিচার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক কষ্টে থাকা পরিবারগুলোর চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা, সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান, যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তবে ভয় বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিবেশ থাকবে না।
রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়না ঘর’ থাকবে না এবং কোনো পরিবারকে প্রিয়জনের অপেক্ষায় এভাবে কষ্ট পেতে হবে না। গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা যত প্রভাবশালীই হোক, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলেও তিনি অঙ্গীকার করেন।











