,

ইলিশের স্বাদ ভুলে যাচ্ছে মধ্যবিত্তরা

news-image

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, বরিশাল ব্যুরো ও চাঁদপুর-ভোলা-বরগুনা প্রতিনিধি
পহেলা বৈশাখে পান্তাভাত আর ভাজা ইলিশ যেন বাঙালির এক রীতি। বাংলা নববর্ষ উদযাপনে বরাবরই ইলিশের চাহিদা বাড়ে। সেই সঙ্গে বাড়ে দামও। তবে এবার সংকট দ্বিগুণ আকার ধারণ করেছে। কারণ একদিকে ইলিশের পোনাসহ (জাটকা) সব মাছ রক্ষায় দুই মাসের জন্য পদ্মা-মেঘনাসহ ৬টি নদী অঞ্চলে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। অন্যদিকে পহেলা বৈশাখে ইলিশের বাড়তি চাহিদা। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ইলিশের দাম। বিক্রি হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি দামে। ফলে প্রিয় এই মাছটি অনেকের জন্যই আর উৎসবের অংশ নয়, বরং এক ধরনের বিলাসী স্বাদে পরিণত হয়েছে। সুপারশপসহ বাজারে কমবেশি ইলিশের দেখা মিললেও তা সাধারণ ক্রেতা তথা মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর কারওয়ানবাজারসহ কয়েকটি বড় পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাঝারি থেকে বড় আকারের ইলিশ কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা। তারা জানান, ঐতিহ্যের টানে ইলিশ কিনতে এলেও দাম বেড়ে যাওয়ায় আর সবার পক্ষে কেনা সম্ভব হচ্ছে না। বিক্রেতারা জানান, নববর্ষ উপলক্ষে ইলিশের চাহিদা বহগুণ বেড়েছে। সেই তুলনায় বাজারে ইলিশের সরবরাহ নেই। যে কারণে ইলিশ মাছ বেশি দরে কিনতে হয়েছে, এ জন্য কিছুটা দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার সূত্রে জানা যায়, কয়েক দিন আগেও ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১১০০-১২০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও এখন তা ১৪০০-১৬০০ টাকায় উঠেছে। ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২২০০-২৪০০ টাকায়। বড় আকারের (দেড় কেজি) ইলিশের দাম প্রতি কেজি ২৬০০ থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে।

ইলিশ কিনতে আসা চাকরিজীবী রিফাত মাহমুদ বলেন, বাজারে ইলিশ কিনতে এসেছি, দেখি যে দাম অনেক বেশি। ইলিশ আমার পক্ষে কেনা সম্ভব না।

আরেক ক্রেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, অন্য মাছের দাম মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও ইলিশের দাম অনেক বেড়েছে। আগে যে মাছ ১ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পহেলা বৈশাখ এলেই চাহিদা বাড়ে, তবে এত বেশি আগে বাড়েনি।

বরিশালে ইলিশের বাজারে বৈশাখের চাপ : বরিশালে মাছের বাজারে শুরু হয়েছে বৈশাখের আমেজ। চাহিদা বাড়লেও বাজারে সরবরাহ কম। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দামে পড়েছে প্রভাব। আকারভেদে কেজিপ্রতি ইলিশের দাম মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। গতকাল শনিবার নগরীর পোর্ট রোড বাজার, বাংলাবাজার, চৌমাথা বাজার, সাগরদী বাজার, রূপাতলী বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে।

বাজারে আকারভেদে ১ কেজি ২০০ গ্রামের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা। যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয় আড়াই হাজার থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। ১ কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। আর ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে আড়াই হাজার টাকায়। যা সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে আড়াইশ থেকে ৩০০ টাকা। ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা, কোথাও কোথাও ২২শ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে।

পোর্ট রোড বাজারের মাছ ব্যবসায়ী শহীদ হোসেন বলেন, জেলেরা খুবই কম মাছ পাচ্ছে জালে যে কারণে এ বছর মাছের আমদানি খুবই কম। বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেশি থাকলে আমরাও কম দামে

মাছ বিক্রি করতে পারতাম। এ বছর বাজারে মাছের আমদানি কম থাকায় এক সপ্তাহ আগেই ইলিশের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

নগরীর চৌমাথা বাজারে মাছ কিনতে আসা নাসিমা বেগম বলেন, প্রতিবছরই আমরা পহেলা বৈশাখের ৫-৬ দিন আগেই ইলিশ কিনে থাকি। বাজারে এসে পছন্দ অনুযায়ী মাছ পাচ্ছি না, আবার দামও কেজি প্রতি তিন থেকে চারশ টাকা বেশি রাখছে। সিন্ডিকেট করে বাজারে আমদানি কমিয়ে মাছের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে কিনা, এ সন্দেহের কথা জানিয়ে সরকারকে মনিটর করার অনুরোধ জানান তিনি।

চাঁদপুরে ইলিশ ছাড়া অন্য মাছই ভরসা : গেল কয়েক বছর ধরে পহেলা বৈশাখে চাঁদপুরের পদ্মা মেঘনার অভয়াশ্রম এলাকায় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ নিষিদ্ধ থাকায় পান্তা ইলিশের প্রচলন এখন নেই বললেই চলে। তবে পান্তার সঙ্গে একাধিক আইটেমের ভর্তা, রূপচাঁদা, তেলাপিয়াসহ অন্যান্য মাছের এখন কদর বেড়েছে। আবার কেউ কেউ পূর্বে সংরক্ষণ করে রেখে পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশেরও আয়োজন করছে। যদিও ইলিশের আকাশচুম্বী দাম হওয়ায় এই আয়োজন এখন অনেক কম। তবে এখন প্রকাশ্যে ইলিশ বিক্রি নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।

বিগত সময়ের ন্যায় এবারও মার্চ-এপ্রিল দুই মাস চাঁদপুরের অভয়াশ্রম এলাকায় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন ও মজুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে জাটকা ধরা নিষেধাজ্ঞার নিয়ম চালু হওয়ার আগে চাঁদপুরের ইলিশের চাহিদা ছিল বেশি।

চাঁদপুর প্রেসক্লাব সভাপতি সোহেল রুশদী বলেন, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাটকা সংরক্ষণে জেলার সর্বমহল সচেতন ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যে কারণে পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশ খাওয়ার প্রচলন বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় প্রেসক্লাব থেকেই পান্তা ইলিশ খাওয়ার মাধ্যমে পহেলা বৈশাখের উদযাপন কার্যক্রম শুরু হতো। এখন মেনু পরিবর্তন করে অন্য মাছ রাখা হয়েছে।

চাঁদপুর শহরের ট্রাক রোড এলাকার গৃহিণী ফাতেমা আক্তার বলেন, একসময় পহেলা বৈশাখের জন্য ইলিশ সংরক্ষণ করে রাখা হতো এখন আর তা করা হয় না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রথমত ইলিশের চড়া দাম, পাশাপাশি প্রশাসনেরও নিষেধাজ্ঞা।

চাঁদপুরের কবি ও লেখক অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামান রনি বলেন, পান্তা ইলিশ পহেলা বৈশাখে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ ছিল। ইলিশের দাম বৃদ্ধি এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে চাঁদপুরে এই প্রচলন এখন বন্ধ।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি আব্দুল বারী জমাদার মানিক জানান, চাঁদপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে মার্চ-এপ্রিল দুই মাস ইলিশ বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বেআইনি কোনো কার্যক্রম করলে সে বিষয়ে প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার পূর্বে বড় সাইজের ইলিশ বিক্রি হয়েছে আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা কেজি।

চাঁদপুর সদর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, জাটকা সংরক্ষণ এবং ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মার্চ এপ্রিল দুই মাস দিন ও রাতে টাস্কফোর্স কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। ইলিশ যাতে প্রকাশ্যে বিক্রি করতে না পারে সেজন্য জলে-স্থলে সব জায়গায় অভিযান চলমান।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, পান্তা ইলিশ বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের একটি সংস্কৃতি। এটি সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের একটি আবেগ, যা বলে বোঝানো যাবে না। তবে যেহেতু এ সময়ে ইলিশ ধরা বন্ধ, তাই সরকারের দেওয়া এই নিষেধাজ্ঞাকে সম্মান করেই এদেশের মানুষ ইলিশ বাদ দিয়েই পহেলা বৈশাখের আনন্দ উপভোগ করছে।

ভোলাতেও ইলিশ কম : সরবরাহ কম থাকায় ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় ভোলাতেও এবার পহেলা বৈশাকে ইলিশ পাচ্ছে না উৎসবপ্রেমী মানুষ। মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা থাকায় দাম বেশি দিয়েও পাচ্ছে না সখের ইলিশ। তাই ইলিশ ছাড়া পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে হবে ভোলাবাসীকে।

জেলা প্রশাসনে আয়োজনেও থাকছে না ইলিশ। জেলা মৎস্য কমকর্তা ইকবাল হোসেন জানান, ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এ বছর পহেলা বৈশাখে পান্তার সঙ্গে ইলিশ থাকবে না, বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে।

পহেলা বৈশাখে বরগুনায় ইলিশের সংকট : দেশের বৃহত্তম পাইকারি ইলিশ বাজার পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে দেখা দিয়েছে ইলিশ সংকট। জ্বালানি তেলের ঘাটতির কারণে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারছে না অধিকাংশ ফিশিং বোট, ফলে বাজারে নেই ইলিশের সরবরাহ।

ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি বছর এই সময়টিতে বাজারে ইলিশের ব্যাপক সরবরাহ থাকলেও এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৈশাখ উপলক্ষে চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ, কিন্তু সরবরাহ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। এতে করে নদীর ইলিশই এখন একমাত্র ভরসা, আর সেই ইলিশ বিক্রি হচ্ছে অস্বাভাবিক দামে।

পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার ও ফিশিং মার্চেন্ট মোস্তফা আলম জানান, সকালে সাগর থেকে আসা একটি ট্রলারে কিছু ছোট আকারের ইলিশ পাওয়া গেলেও সেগুলো কয়েকদিন আগে ধরা হয়েছে। তুলনামূলক কম দামে, প্রতি মণ ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।

পাথরঘাটা মৎস্য বন্দরের ব্যবসায়ী ইমরান খান বলেন, বৈশাখকে ঘিরে বাজারে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় যে অল্প মাছ আসছে, তা পাইকাররা খোলা ডাকেই কিনে নিচ্ছেন এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। স্থানীয় বাজারে কার্যত কোনো ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না।

বিএফডিসি মার্কেটের আড়তদাররা জানান, সরবরাহ সংকটের কারণে তাদের বেচাকেনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিবছর এই সময়ে যেখানে জমজমাট ব্যবসা থাকে, সেখানে এবার তাদের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে। জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব আগামী ইলিশ মৌসুমেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

 

 

এ জাতীয় আরও খবর

নবীনগরে পুকুরের পানিতে ডুবে শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

দুর্গাপূজায় নিরাপত্তার ঘাটতিতে কোনো ছাড় নয় : ডিসি ফরিদা

প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে বড় সুখবর

দাম্পত্য জীবনে সুখের ‘রেসিপি’ জানালেন শুভ

চাপ দিয়ে লংমার্চ থামানো যাবে না, চাবিকাঠি ইমরান খানের হাতে: পিটিআই

বাড়ল জেট ফুয়েলের দাম, কার্যকর মধ্যরাত থেকেই

বাংলাদেশ-ইইউ এফটিএ দ্রুত বাস্তবায়নে জার্মান রাষ্ট্রদূতের গুরুত্বারোপ

পুতিনকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন ইরান প্রেসিডেন্ট, ফোনালাপে আর কী কথা হলো?

আবরার হত্যা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করার চেষ্টা ছিল: রিজভী

ইয়েমেনে জীবনের তাগিদে ভিটেমাটি ছেড়ে পালাচ্ছে মানুষ

যুদ্ধ থামাতে ইরানকে নতুন শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের

ক্যান্সার চিকিৎসায় দেশে আসছে ১৭ রেডিওথেরাপি মেশিন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী