,

খুনের পর লাশ টুকরো টুকরো করে আবীর

news-image

আকমাল হোসেন, চট্টগ্রাম
নগরীর বন্দরটিলার নয়ারহাটের খালপাড় সংলগ্ন তিনতলা একটি ভবন ঘিরে আশপাশের মানুষের কৌতূহল। ভিড় ঠেলে সামনে এগোতেই শুনতে পাওয়া যায় ভবনটির দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসা বুকভাঙা বিলাপ ও আহাজারির শব্দ। ফ্ল্যাটটিতে ঢুকেই অতিথি কক্ষে দেখা যায়, বিলাপ করতে করতে এক নারী বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। চেতনা ফিরলেই নিজের চার বছর ১১ মাস বয়সী মেয়ে আলীনা ইসলাম আয়াতকে খুঁজে ফিরছেন। তিনি ১০ দিন আগে নিজ বাসার সামনে থেকে নিখোঁজ হওয়া আয়াতের মা শাহেদা আক্তার তামান্না।

বিলাপ করতে করতে বারবার বলছিলেন, ‘আমার এই ৪ বছরের বাচ্চাটাকে কীভাবে ছয় টুকরা করে কেটে ফেলল আবীর। কী দোষ ছিল আমার মেয়েটার। আমরা তো কোনোদিন কারও ক্ষতি করিনি, তাও কেন আমাদের সঙ্গে আল্লাহ এমন করলেন? বাচ্চাটা আমার মক্তবে যাচ্ছিল পড়তে, কিন্তু এখন তার ছোট্ট শরীরটাই আর দেখতে পেলাম না।’ কাঁদতে কাঁদতে ফের মূর্ছা যান তামান্না। প্রতিবেশী নারীরা শত চেষ্টা করেও তার মন ভোলাতে পারেননি। এই চিত্র গতকাল শুক্রবার দুপুরের।

গত ১৫ নভেম্বর নিজ বাড়ির সামনে থেকে নিখোঁজ হওয়া আলীনা ইসলাম আয়াত মুক্তিপণের জন্য অপহরণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। অপহরণকারী এক তরুণ তাকে হত্যার পর লাশ কেটে ছয় টুকরা করে সাগর ও খালে ভাসিয়ে দিয়েছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কর্মকর্তারা বলছেন, গতকাল আবীর আলী (১৯) নামে অপহরণকারী ওই তরুণকে আটকের পর এসব তথ্য জানতে পেরেছেন তারা। আবীরের পরিবার শিশু আয়াতের বাসায় ভাড়া থাকে।

শাহেদা আক্তার তামান্নার পাশে বসে বুক চাপড়ে নিজের নাতনিকে এনে দেওয়ার কথা বলছিলেন আয়াতের নানি। আহাজারি করতে করতে তিনি বলেন, ‘আমার নাতিকে যে এমন নৃশংসভাবে মেরেছে তাকে আমাদের কাছে আনো, তাকে আমি জিজ্ঞেস করতে চাই এই মাসুম বাচ্চাটা কী করেছিল তার?’

বাসাটির আরেকটি কক্ষে কান্নারত আয়াতের ছোট চাচা সুমন বলেন, ‘আবীর আমাদের অনেক পুরনো ভাড়াটিয়া। আমার ভাতিজিকে ডাক দিলেই সে দৌড়ে আবীরের কোলে উঠত। কিন্তু এই আবীর যে আমার মেয়ের মতো ভাতিজিকে এভাবে টুকরো করবে তা আমার কল্পনাতেও নেই। কী দোষ ছিল আমার আয়াতের? ঘটনার দিনও আমার ভাতিজিকে সে ডেকে বাসায় নিয়ে গেছে আর শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলেছে।’

মেয়ে হত্যার শিকার হয়েছে এমন তথ্য জানার পর শোকে স্তব্ধ হয়ে যান আয়াতের বাবা সোহেল রানা। তিনি শুধু বলেন, ‘যেদিন আমার আয়াত হারায়, সেদিন আবীরও আমাদের সঙ্গে আয়াতকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। আমি তাকে কত করে জিজ্ঞেস করলাম, সে আমার আয়াতকে দেখেছে কি না। কিন্তু সে জানায়, আয়াতকে দেখেনি। এত বড় ঘটনা ঘটিয়ে সে একটুও ভয় পায়নি। সে আমাদের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল এবং বুঝতে দেয়নি সে কত বড় অপরাধ করেছে।’

নিজ বাসা থেকে মক্তবে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয় আয়াত। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আশপাশে তাকে না পেয়ে ইপিজেড থানায় জিডি করা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে। কিন্তু আয়াতের দাদা মো. মঞ্জুর কাছে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি পিবিআই অফিসে যান সহযোগিতার জন্য। এরপর পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম অফিসের কর্মকর্তারা জিডির ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেন। তারা স্থানীয় শিশুদের কাছ থেকে জানতে পারেন যে ঘটনার দিন আবীর নামে এক যুবক আয়াতকে কোলে নিয়ে ঘুরছিল। পরে পিবিআই কর্মকর্তারা আবীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে আয়াতকে কোল থেকে নামিয়ে নিজের কাজে চলে গিয়েছিল বলে জানায়। এরপর আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আয়াত নিখোঁজের পরদিন ভোর ৬টার একটি ব্যাগ নিয়ে বাসা থেকে বের হচ্ছে আবীর। ব্যাগটি সাধারণ আকারের চেয়ে বেশি বড় হওয়ায় তাকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করেন পিবিআই কর্মকর্তারা। তখন সে জানায়, তার মা-বাবা আলাদা হয়ে যাওয়ায় সে তার মালামাল মায়ের নতুন বাসা আকমল আলী রোড এলাকায় নিয়ে যেতে বড় ব্যাগ ব্যবহার করেছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্যাগটা দেখাতে বললে সে তা দেখাতে পারেনি। এরপর জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে গতকাল জানায়, ওই ব্যাগে শিশু আয়াতের খণ্ডবিখণ্ড ছয় টুকরা লাশ ছিল। যা সে খালে ও বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিয়েছে।

নিহত আয়াতের বাড়ির পাশের ফোরকান নামে এক গার্মেন্টসকর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবীর এখানে অনেকদিন থেকে থাকে এবং ইপিজেডের একটি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। বেশ কিছুদিন থেকে দেখতাম আয়াতের সঙ্গে মিশতে চেষ্টা করত, আদর করত। ভাবতাম একই ভবনের বাসিন্দা এবং আয়াতও ছোট তাই আদর করে। কিন্তু তার আদরের পেছনে এত বড় ভয়াবহতা ছিল তা আজকের ঘটনা উদঘাটন না হলে কখনো জানতেই পারতাম না কীভাবে একটি বাচ্চাকে এভাবে শ্বাসরোধ করে মেরে টুকরো করতে পারে।’

আয়াত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পিবিআই চট্ট-মেট্রোর পুলিশ সুপার নাঈমা সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আয়াতের নিখোঁজের বিষয়টা আমাদের হাতে আসার পর আমরা খুব গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করি। বিভিন্নজনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে গিয়ে আবীরের বিষয়টি জানতে পারি। প্রথমবার জিজ্ঞাসাবাদে সে কিছুই জানে না বলে দাবি করে। কিন্তু ফুটেজে দেখা যায়, তার কাছে বড় ব্যাগ আছে এবং তা নিয়ে কোথায় যাচ্ছিল জানতে চাইলে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে। তখন আমরা একটি টিম তার বাসায় পাঠালে সে ব্যাগটি দেখাতে পারেনি। বাসার ভেতরে তদন্ত করতে গিয়ে আমরা বাথরুমের ওপর সানশেডে জমাট রক্ত দেখতে পাই। তখন আবীরকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে আয়াতকে হত্যার বিষয়টা স্বীকার করে।’

পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আবীর গত ছয় মাস ধরে আয়াতকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করবে বলে পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সে এই কাজ করতে পারেনি। পরে গত ১৫ নভেম্বর অপহরণ করে নিজের বাসায় নিয়ে গেলে আয়াতের চেঁচামেচিতে আবীর ভয় পায় এবং তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরবর্তী সময়ে রাতের কোনো এক সময় আয়াতকে কেটে ছয় টুকরো করে। আসিফ নামে এক বন্ধুর সাহায্য নেয় বস্তা ও রিকশা এনে দিতে। কিন্তু আয়াতের লাশ ছয় টুকরো করে তিন টুকরো খালে আর তিন টুকরো সাগরে ফেলে দেওয়ার পুরো কাজটা সে একাই করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আবীর প্রায়ই টেলিভিশন সিরিজ ক্রাইম পেট্রোল ও সিআইডি দেখত, আর শেখার চেষ্টা করত কীভাবে অপহরণ ও লাশ গুম করে স্বাভাবিক, সাবলীল থাকা যায়। আয়াতকে অপহরণ ও টুকরো করার পর সে খুব স্বাভাবিকভাবেই সবার সঙ্গে মিলে নিখোঁজ আয়াতকে খুঁজতে পরিবারকে সাহায্য করে।’

নিহত আয়াতের খণ্ড দেহাবশেষগুলো উদ্ধার সময়সাপেক্ষ জানিয়ে পিবিআই কর্মকর্তা নাঈমা সুলতানা বলেন, ‘যেহেতু সে (আবীর) তিন টুকরো জোয়ারের আগে খালে এবং বাকি তিন টুকরো সাগরে ফেলেছে। তাই পানির স্রোতে দূরে কোথাও চলে গিয়েছে। আমরা আয়াতের লাশ খুঁজতে এখন মাঠে আছি।’

 

এ জাতীয় আরও খবর

বিদায়ি বক্তব্যে কাঁদলেন মির্জা ফখরুল

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১৪ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার

১২ জেলায় ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা

ময়মনসিংহে এনসিসি ব্যাংকের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন ও বৃক্ষবিতরণ অনুষ্ঠিত

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশকে ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের সভা

জিয়া-খালেদার সমাধিতে বিএনপির নতুন ৪ নেতার শ্রদ্ধা

সমাজের সবাই এগিয়ে এলে বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় পতন

রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করতে চাই: মির্জা ফখরুল

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে যা করবেন, যা করবেন না