,

মার্কেসের জাদুর আয়না

তিনি যেন নিজেই ম্যাজিক। সাধারণ সাহিত্যরসিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক—সবাই তাঁর মুগ্ধ-পাঠক। নিরেট বাস্তবতার ছবি তিনি আঁকেন না। অথচ তাঁর লেখায় সবাই খুঁজে পায় নিজেরই আত্মীয়-পরিজন, স্বদেশ। জাদুবাস্তবতার সফল রূপকার গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের প্রয়াণে আমাদের শ্রদ্ধা

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস [৬ মার্চ ১৯২৭—১৭ এপ্রিল ২০১৪], প্রতিকৃতি: মাসুক হেলালএ খবরটি এখন বাসি যে আমাদের জীবনকালের সবচেয়ে বিখ্যাত লেখককে আমরা হারিয়েছি কদিন আগে। কথাশিল্পের জাদুকর গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এই ধরাধাম ছেড়ে চলে গেছেন নিজের উপন্যাসের অসংখ্য হাইপারবোলিক বা অতিশয়োক্তিমূলক ঘটনার মতোই এক মহাকাণ্ড ঘটিয়ে। তাঁর লেখায় গরমকালে এমন গরম পড়ে যে মুরগিরা সরাসরি ভাজা ডিম পাড়া শুরু করে কিংবা যখন বৃষ্টি হয়, একটানা চার বছর এগারো সপ্তাহ দুই দিন ধরে পড়তেই থাকে সেই বৃষ্টি। মার্কেসের মৃত্যুতে পৃথিবীতে আমরা সে রকম হাইপারবোলিক কাণ্ডই ঘটতে দেখলাম—সত্তরজনের মতো রাষ্ট্রনায়ক শোক প্রকাশ করলেন, দেড় শয়ের বেশি দেশের প্রধান সংবাদপত্রগুলো তাদের প্রথম পাতায় ছাপাল তাঁর মৃত্যুর সংবাদ, আর টেলিগ্রাফ পত্রিকার হিসাবে দুনিয়ার সবগুলো প্রধান সংবাদপত্রের সংখ্যা যদি হয় মোট ১০০, তাহলে এর ৮৩টিই মার্কেসের মৃত্যু নিয়ে পত্রিকায় সম্পাদকীয় প্রকাশ করল। আমরা চোখের সামনে একজন লেখককে মর্ত্য থেকে বিদায় নিতে নয়, বরং যেন ভূলোক থেকে স্বর্গের পথে সরাসরি দেবরাজ জিউস হয়ে হাত নাড়তে নাড়তে উঠে যেতে দেখলাম; ঠিক যেভাবে তাঁর উপন্যাস ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস্ অব সলিচ্যুড-এ পরমাসুন্দরী রেমিদিওস দ্য বিউটি একদিন বিকেল চারটায় উঠোনে সাদা একটা চাদর ভাঁজ করতে করতে উড়ে চলে গিয়েছিল সেই একই পথে। 

রেমিদিওস ছিল মাকোন্দোর ইতিহাসের সবচেয়ে রূপসী, যার প্রতি ভালোবাসা ও কামনায় জর্জর হয়ে টপ্ টপ্ করে মারা যাচ্ছিল সেখানকার যুবকেরা। তার এত রূপ ও প্রজ্ঞা ধারণ করার জন্য তৈরি ছিল না পৃথিবী, তাই তাকে যেতেই হলো। মার্কেসের উজ্জ্বল-বর্ণ, অতি ঘন বুনোট গদ্যের (জড়ানো-প্যাঁচানো, শিকড়ে শিকড়ে এক হয়ে থাকা জঙ্গলের হাজারো গাছের ঘন-জমাট নিবিড়তার কথা মনে আসে তাঁর অধিকাংশ বাক্য পড়লেই) সৌন্দর্যও এমন যে তা পড়ে শেষ করে ওঠার সুগহন হাহাশ্বাস আর আনন্দ, পুলক আর সন্তাপ সব পাঠক সইতে পারেন না। এমনও বাস্তব উদাহরণ আছে যে চন্দ্রগ্রস্ত হওয়ার মতো তাঁর গদ্যগ্রস্ত হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে পাঠককে; প্যারাগুয়েতে পুলিশকে আসতে হয়েছে গভীর রাতে কোনো পাঠকের বাড়ির সামনে বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘গাবো, গাবো’ আর্তনাদ থামাতে। মার্কেসের গভীর গদ্যের আঠালো আচ্ছন্নতায় পাগল এসব পাঠক পাড়ার লোককে ঘুমোতে দিচ্ছে না তাই নিশ্চিত কেউ না কেউ ফোন করেছিল থানায়। অতএব, বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি পাঠককে তাঁর জাদুকরি গদ্যের ভাববিহ্বলতায় মজে শ্বাসরুদ্ধ হওয়া থেকে খানিক থিতু হতে দেওয়ার জন্যই যেন গার্সিয়া মার্কেসকেও শেষমেশ চলে যেতেই হলো।

পশ্চিমা মিডিয়া মার্কেসকে ইতিমধ্যে ‘পাঠক ও সমালোচক দুয়ের কাছেই পূজনীয়’ এমন অতি দুর্লভ লেখক তালিকায় চার্লস ডিকেন্স, মার্ক টোয়েন ও লিও টলস্টয়েরও ওপরে স্থান দিয়ে ফেলেছে। তারা বলছে, সমালোচকদের চোখে বোর্হেস আধুনিক লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের সবচেয়ে বড় তারকা হতে পারেন, কিন্তু পাঠক ও সমালোচকের যোগফলের বিমূর্ত যে জায়গা, সেখানে মার্কেসের ওপরে কেউ নেই—বিশ্বসাহিত্যে কোনো কালেও কেউ ছিল না। 

এ দাবির সত্যতা কতটুকু? জানি না। আমার শুধু মনে পড়ছে মাত্র মাস তিনেক আগে দ্বিতীয়বার তাঁর ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস্ অব সলিচ্যুড পড়ার কথা। মধ্য বয়সের নিরাবেগ এই দ্বিতীয় পাঠে মনে হলো, উপন্যাসটি মাস্টারপিস এ কারণেই যে এটা একটা এপিসোডিক আখ্যান, যার আবার রয়েছে কঠোর এক প্রকরণ। এপিসোডিক আখ্যান আর কঠোর সুশৃঙ্খলতা সাধারণত একসঙ্গে যায় না। শৃঙ্খলা সেখানে ভেঙে পড়ে অনেক এলেবেলে আকার নিয়ে, ঠিক যেমনটা পড়েছে গুন্টার গ্রাসের টিন ড্রাম বা সালমান রুশদির মিডনাইটস্ চিলড্রেন-এ। ফর্মের এই শিথিলতা মার্কেসের উপন্যাসে একদমই নেই—সবকিছু ছকে বাঁধা, অতি গোছানো। শুরু থেকেই আমরা জানি, সেখানে মাকোন্দো নামের গ্রামটি মাত্র এক শতাব্দীই টিকবে, অতএব, এ উপন্যাসের ন্যারেটিভের দৈর্ঘ্য প্রথম থেকেই একটা সীমার মধ্যে ধরাবাঁধা। আবার কিছু দূর এগিয়ে আমরা এও জেনে যাই, যে বইটি পড়ছি তা মেলকিয়াদেস্ নামের এক আজব জিপসির লেখা; আর অরেলিয়ানো যখন সেই বইয়ের শেষ পাতাগুলো পড়ছে, আমরাও তখন তার সঙ্গে মিলে তা-ই পড়ছি; এরপর যেইমাত্র ওই এক শ বছর শেষ হলো, মাকোন্দো নামের গ্রাম ও মেলকিয়াদেসের সেই পাণ্ডুলিপিও উড়ে গেল হাওয়ায়।

উপন্যাসটি প্রকাশ হওয়া মাত্র বিশ্বজয় করে ফেললেন মার্কেস। এই অতিদ্রুত বিশ্বজয়ের বড় কারণ, এটাই বিশ্বসাহিত্যে জাদুবাস্তবতার প্রথম বড় মাপের লেখা। জাদুবাস্তবতা একটা টেকনিক—আপাত স্বাভাবিক, দৈনন্দিন পৃথিবীর কিছু কিছু জিনিস সেখানে অবিশ্বাস্য কিছু নিয়মে বা ভঙ্গিতে ঘটে। দ্বিতীয় পাঠেও আমি একইভাবে অভিভূত হয়েছিলাম উপন্যাসের সেই অংশে এসে যেখানে এক সদ্য মৃত পুত্রের রক্ত সারা গ্রাম ঘুরে এসে শেষমেশ তার মায়ের পায়ের কাছে হাজির হলো। আরেকটা চিরস্মরণীয় অংশ রয়েছে কর্নেল অরলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার হতভাগ্য ১৭ পুত্রকে নিয়ে। ৩২টি গৃহযুদ্ধে অংশ নেওয়া এই কর্নেলের ১৭ ছেলে জন্মেছে ভিন্ন ভিন্ন ১৭ নারীর

এ জাতীয় আরও খবর

‘প্লেয়ার্স বাই চয়েজে’ সমাধান! সম্মানজনক পারিশ্রমিক দাবি ক্রিকেটারদের

মাতৃত্বের পর শরীর নিয়ে কটাক্ষ, এবার মুখ খুললেন ক্যাটরিনা

একাদশে ভর্তি থেকে ছিটকে পড়লো ১ লাখ ২৭ হাজার শিক্ষার্থী

এবার গুলশানের এডিসিসহ চার কর্মকর্তাকে বদলি

নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পাবেন না যারা

আল্লাহর কসম, এই দাবিগুলো দলের নয়, জনগণের: জামায়াত আমির

ডেঙ্গুর থাবা সারাদেশে, রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও

মুন্সীগঞ্জে বাস-প্রাইভেটকার সংঘর্ষে নিহত ৪

প্রয়োজনে জীবন দেব, দাবি আদায় না করে ঘরে ফিরব না : শফিকুর রহমান

রাজধানীতে ৩ বাসে আগুন

অপ্রতিম হত্যা: সিসিটিভির সূত্রে ৩ জন আটক

এসডিজি অর্জনে বিশ্বনেতাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর