সৌদিতে হামলার পর আতঙ্কে প্রবাসীরা, রেমিট্যান্সে প্রভাবের শঙ্কা
অনলাইন ডেস্ক : সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। গত শনিবারের ওই হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও তিন শতাধিক আহত হয়েছেন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করায় আকাশপথে যাতায়াত ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং দেশে থাকা পরিবারের আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
এ ঘটনায় রোববার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিহত বাংলাদেশিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশের পাশাপাশি রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে হতাহতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক হারে বাংলাদেশি কর্মীর চাকরি হারানোর কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শ্রমবাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়া, কর্মীদের আয় কমে যাওয়া এবং দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাড়তে পারে ঝুঁকি
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা আবাসিক মিশনের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সংবাদমাধ্যম আমাদের সময়কে বলেন, গত চার মাস ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিম্নমুখী রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রবাসীরা ব্যাপক হারে দেশে ফিরে আসছেন বা বেকারত্ব বেড়ে গেছে। তাঁর মতে, ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে অন্য মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর প্রবণতাও রেমিট্যান্স কমার একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, চলমান যুদ্ধের প্রভাব ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে না—এমন নিশ্চয়তা নেই। পরিস্থিতির অবনতি হলে ঝুঁকিও বাড়বে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি। দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রমবাজারে অস্থিরতা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাঁর মতে, সংঘাতের কারণে প্রবাসীরা কর্মহীন হয়ে পড়লে একদিকে তাঁদের আয় কমবে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে সৌদি আরবের গুরুত্ব
বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় গন্তব্য সৌদি আরব। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে কাজের উদ্দেশ্যে গেছেন ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭১৫ জন বাংলাদেশি। ওই বছর বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন প্রায় ১১ লাখ ১৭ হাজার কর্মী। অর্থাৎ, বিদেশগামী কর্মীদের প্রায় ৬৭ শতাংশের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সৌদি আরবে আনুমানিক ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন। তাঁরা বছরে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ দেশে পাঠান। ফলে দেশটির শ্রমবাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব প্রবাসীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবার এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
রেমিট্যান্স কমলে চাপে পড়বে পরিবারগুলো
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে দেশে প্রায় ৫৮৪ কোটি ৯১ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশটি থেকে এসেছে প্রায় ১১৪ কোটি ৫৯ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।
তবে সংঘাতের কারণে কর্মীদের চাকরি হারানো, আয় কমে যাওয়া কিংবা দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর দৈনন্দিন ব্যয়, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে বিদেশে যাওয়ার জন্য ঋণ নেওয়া কর্মীরা দীর্ঘদিন কাজ করতে না পারলে আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন। বিমান চলাচল ব্যাহত হলে নতুন কর্মীদের যাত্রা এবং ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কর্মহীন প্রবাসীর প্রকৃত সংখ্যা অজানা
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কতজন বাংলাদেশি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, কতজন নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না কিংবা কতজন দেশে ফিরেছেন—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো সরকারের কাছে নেই। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের পুনর্বাসন, আর্থিক সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রয়োজন নির্ধারণ করা কঠিন হচ্ছে।
অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে কিছু বাংলাদেশি কর্মী কর্মহীন বা অর্ধবেকার হয়ে পড়েছেন। পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা, সেবা খাত ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ কমে যাওয়ায় কোথাও কর্মী ছাঁটাই, কোথাও বেতন হ্রাস এবং কোথাও মজুরি পরিশোধে বিলম্বের ঘটনা ঘটছে।
অন্যদিকে, অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯০ জন বাংলাদেশি কর্মী দেশে ফিরেছেন বলে সংস্থাটি শনাক্ত করেছে।
ইরান থেকে দেশে ফিরেছেন ১৮৬ বাংলাদেশি
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। গত ২১ মার্চ ইরান থেকে আজারবাইজানের রাজধানী বাকু হয়ে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে ১৮৬ জন দেশে ফেরেন। তাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ১০ জুলাই জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্যে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থায়নে ইরান থেকে মোট ১৮৬ জনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১২ জন নারী ও আটটি শিশু ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
২২ বছরে মধ্যপ্রাচ্যে গেছেন ১ কোটি ১৪ লাখের বেশি কর্মী
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। জাতীয় সংসদে ২০ এপ্রিল উপস্থাপিত বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের ১২টি দেশে ১ কোটি ১৪ লাখ ৭ হাজার ৬৬১ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন।
এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছেন ৫৩ লাখ ৩৩ হাজার ২২৩ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২১ লাখ ৯২ হাজার ৯৫৬ জন, ওমানে ১৬ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৯ জন এবং কাতারে ১০ লাখ ৫ হাজার ৯৩৬ জন। এ ছাড়া কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া ও ইরানেও কাজের উদ্দেশ্যে গেছেন বাংলাদেশি কর্মীরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও চাপ তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।











