বুধবার, ২২শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজ ৭ই মে ব্যারিস্টার একেএম মোজাম্মেল হক ভূঁইয়ার ১০ম মৃত্যু দিবস

news-image

তারিকুল ইসলাম সেলিম : প্রখ্যাত আইনবিদ ব্যারিস্টার একেএম মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া এম.কম, এলএলবি, ব্যারিস্টার এ্যাট-ল (লিঙ্কন’স  ইন, যুক্তরাজ্য), এফ.সি.এ । তিনিই প্রথম এবং একমাত্র বাংলাদেশী যিনি একসাথে ব্যারিস্টার ও এফসিএ -এ দুটি পেশাগত ডিগ্রী অর্জন করেন । তাঁর পরে আজ পর্যন্ত আর কেউই এ দুটি বিষয়ের উপর ডিগ্রী লাভ করতে পারেনি। অভিজাত ব্যাক্তিত্বের অধিকারী ব্যারিস্টার মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া ছিলেন উচ্চমানের একজন স্নিগ্ধা রুচির মানুষ। একজন উচ্চ শিক্ষায় দীক্ষিত হওয়ার পরেও কখনো তাকে অহংকারি আচারন করতে মানুষ দেখেনি । তাঁর মন মানসিকতা স্নেহশীল আচারণ ছিল মানুষের হৃদয়ের দাগ কাটার মতো । মহান এই ব্যক্তি বহু প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে তাদের ক্যারিয়ার জীবনে আত্মপ্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করে দেন।

ব্যারিস্টার মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহারু, হোসেন শহীদ সরোওয়ার্দী, কায়েদে আজম জিন্নাহ, শেরে-এ বাংলা একে ফজলুল হকের মতো বাঘা বাঘা নেতাদের হাতে যখন এক সময় উপমহাদেশ শাষণভারের মূলমন্ত্র তখনও তাদের সবার পেশা ছিল আইন ব্যবসা। তাঁরা সবাই রাজনীতি ও আইন পেশায় সমান্তরালে জড়িত ছিলেন । তখনকার সময়েরর মতো আজও আইন পেশাকে অত্যন্ত সম্মানী পেশা হিসাবে বিবেচিত । সম্মানী পেশা বলেই প্রত্যেক বাবা-মা-ই তাদের সন্তানকে ব্যারিস্টার বানানোর স্বপ্ন দেখতেন । কিন্তু ব্যারিস্টারি পড়ানো এতো সহজ ছিলনা । ব্যারিস্টারি এ্যাট-ল ডিগ্রী অর্জনে করতে হলে  বিলেত (ইংল্যান্ড) যেতে হতো । বহু ব্যয় বহুলতা সাধ্য মধ্যে না থাকায় অনেক পরিবারের ছেলে-মেয়েদের ব্যারিস্টার হওয়ার স্বপ্ন তাদের কাছে অধরায় থেকে গেল। ব্যারিস্টার একেএম মোজ্জামেল হক ভূঁইয়া কিশোরকালেই নাওঘাট গ্রামে জন্ম নেওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহাসিক মোক্তার আব্দুল হামিদ ভূঁইয়া ও উপ-মহাদেশের বিখ্যাত আইনবিদ-দের পেশাগত খ্যাতি সাথে পরিচিত হয়েছিলেন।

ফলে তিনিও এই সমস্ত মনীষীদের মতো খ্যাতিমান হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন । এক সময় ব্যারিস্টার হওয়ার সে স্বপ্নই ধরা পড়ে তাঁর হাতে। তারপর শুধু তিনিই ব্যারিস্টার হওয়া স্বপ্ন পূরণ করেনি । তিনি অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীদদের স্বপ্ন পূরণের সিঁড়ি করে দেন।বাংলাদেশের আইন শিক্ষা প্রসারে তাঁর ছিল অনবদ্য অবদান। এদেশের মানুষ যাতে আন্তর্জাতিক মানের আইন শিক্ষা ও পেশাগত জীবনের সুফল পেতে পারে, তাই তিনি বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ১৯৮৯ সালে ‘ভূঁইয়া একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই ভূঁইয়া একাডেমির প্রতিষ্ঠার মধ্যেমে দূর শিক্ষনে আইন শিক্ষা চালু করে অসাধারণ অবদান রাখেন । যার দ্বারা বৈদেশিক আইনী শিক্ষা অর্জনের পথ উন্মুক্ত হয় । এই ভূঁইয়া একাডেমি-ই হয়ে উঠে অসংখ্যক বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর ব্যারিস্টার এ্যাট-ল হবার গতিপথ। তাঁর গড়া ভূঁইয়া একাডেমি থেকে প্রায় ৪০০-৪৫০ জন (এল.এল.বি) ডিগ্রী সম্পন্ন করে পরবর্তীতে ব্যারিস্টার হবার গৌরব অর্জন করেছেন । এর আগে ব্যারিস্টারি ডিগ্রী অর্জন করতে হলে প্রচুর অর্থ পয়সা খরচ করে ইংল্যান্ডে যেতে হতো । ভূঁইয়া একাডেমি প্রতিষ্ঠা হওয়ার কারণে দেশে থেকেই অসংখ্য শিক্ষার্থীরা তাঁরা তাদের স্বপ্নের সর্বোচ্চ চূড়াই আরোহন করতে পারছেন। ব্যারিস্টার একেএম মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া । ১৯৩৯  সালের ১৫ই জানুয়ারী ত্রিপুরা (তদানন্তিন)  জেলার মহকুমা ব্রাহ্মণবাড়িয়া আশুগঞ্জের (বর্তমানে উপজেলা) ইতিহাস খ্যাত শিক্ষার রাজধানী নাওঘাট গ্রামে ঐতিহ্যবাহী ভূইঁয়া বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন তিনি । বাবা আব্দুর রউফ ভূঁইয়া ছিলেন একজন সমাজসেবক । তিনি গ্রামের অসহায় দুঃস্থ মানুষের সুখ-দুঃখে সহমর্মিতার সাথে সহসায় এগিয়ে আসতেন । মা আমেনা খাতুন ছিলেন আধুনিকমনা গৃহিনী ও অসাধারন শিক্ষানুরাগী । নারীদের শিক্ষায় অগ্রসর করতে তিনি বাবার বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নাওঘাট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করেন। সে সময় নাওঘাট স্কুল থাকলেও মেয়েদের পড়ার মতো তেমন কোন ভাল পরিবেশ ছিল না । এ কারনে মেয়েদের প্রথমিক শিক্ষা পাঠ দিতে তিনি এগিয়ে আসেন ।

চার ভাইয়ের মধ্যে মোজ্জামেল হক ভূঁইয়া তৃতীয়। তাঁর মায়ের হাত ধরেই ব্যারিস্টার ভূঁইয়া কৈশোরকালের স্কুল জীবনের যাতায়াত শুরু। ১৯৫৫ সালে তালশহর এ এ আই উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এস.এসসি পাস করেন । ১৯৫৭ সালে ভৈরবের ঐতিহ্যবাহি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হাজী হাসমত কলেজ থেকে কৃতিত্বে সাথে আইএসসি পরীক্ষা পাস করেন । ১৯৬০ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে বি. কম । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম কম পাস করেন এবং সি.এ অধ্যায়নরত অবস্থায় ব্যারিস্টার-এ্যাট-ল পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান । তিনি ১৯৭২ সালে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত লিঙ্কক’স ইন থেকে বিরল কৃতিত্বের সাথে ব্যারিস্টার এ্যাট- ল ডিগ্রী অর্জন করেন। তারপর তিনি ঐ বছরই বাংলাদেশে পর্দাপণ করেন । দেশে এসে হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্টে বাংলাদেশ সুপরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত খ্যাতিমান আইনবিদ ইনকাম ট্যাক্সের আইনজীবী আশরাফ আলী চৌধুরীর সহকারি হিসাবে আইন ব্যবসায় অভিষেক হন । আশরাফ আলী চৌধুরী ঢাকা দোহার থেকে ৭০ -এর নির্বাচনে এম এন এ নির্বাচিত হন এবং পরে মন্ত্রীও হয়েছিলেন । আইন পেশার পাশাপাশি তিনি ১৯৮৬ সালে এফসিএ ডিগ্রী অর্জন করতে সমর্থ হন। ব্যারিস্টার মোজ্জামেল হক ভূঁইয়া ১৯৭২-৭৩  সালে থেকে অভ্যন্তরীন রাজস্ব বিভাগের রেজিস্টার হিসাবে ব্রিটিশ চাকুরীতে যোগদেন।  ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে একজন ব্যারিস্টার হিসাবে ইংলিশ বার তাকে আহবান জানান। তিনি ১৯৮৬ সালে একজন ফেলো চার্টার্ড একাউন্টেন্ট (এফসিএ) নিয়োজিত হন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক আইনে খন্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। দেশি ও আর্ন্তজাতিক সরকারি ও বেসরকারি বহুত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইন উপদেষ্টা ছিলেন । এছাড়াও তিনি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজাল্যান্ড, কানাড, জার্মান, ভারত, ফ্রান্স, থাইল্যানসহ আর্ন্তজাতিক বহু আইন সস্মেলনে আইন বিশেষেজ্ঞ ও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগদান করেন এবং অনেক প্রতিষ্ঠানকে তিনি আইনী সহায়তা প্রদান করেন । তিনি সুপ্রিম কোর্টের জেষ্ঠ আইনজীবি ছিলেন । ল’ জার্নালে তাঁর মামলার সংখ্যা প্রকাশিত হয় ।

সামাজিক উন্নয়নেও ব্যারিস্টার একেএম মোজ্জামেল হক ভূঁইয়ার প্রশংসনীয় ভূূূমিকা ছিল । তাঁর অনন্য সাধারণ সামাজিক কর্মকান্ড ও জনহিতকর কাজের জন্য মানুষের মনে আজও অমরত্ব হয়ে আছেন । বিপুল সংখ্যক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, এতিমখানা, ও মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতা করা ছাড়াও তিনি মিস ভ্যালোরি টেলর এর সাথে পক্ষাঘাতগ্রস্ত লোকদের চিকিৎসার জন্য সাভারে এশিয়ার সর্ববৃহৎ কেন্দ্র বর্তমান ‘সেন্টার ফর দি রিহ্যাবিলিটেশন আফ দি প্যারালাইজড (সিআরপি) প্রতিষ্ঠা করেন। এবং দীর্ঘ ২২ বছর  উক্ত প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যারিস্টার ভূঁইয়া ১৯৮২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ট্রাস্টি বোর্ডের-ও চেয়ারম্যান ছিলেন । এদেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যারিস্টার একেএম মোজাম্মেল হক ভূঁইয়ার পারিবারিক অবস্থানেও খুবই সু-খ্যাতি রয়েছে তাঁর পরিবারের ।  উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহের সাবেক উপাচার্য ড.প্রফেসর জেট এইচ ভূঁইয়া তাঁর বড় ভাই । মেজু ভাই ডাক্তার নূরুল হক ভূঁইয়া স্থানীয়ভাবে খুবই খ্যাতিমান ছিল।

ছোট ভাই মোঃ ছানাউল হক ভূঁইয়া এম ফার্ম, এম.এস, উপ-পরিচালক (হসপিতাল), আমেরিকা । ব্যারিস্টার মোজাম্মেল হক ভূঁইয়ার এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক। তাঁর সহধর্মিনী খ্যাতনামা আইনবিদ ও রাজনীতিক ব্যারিস্টার রাবেয়া ভূইয়া এমপি, ব্যারিস্টার এ্যাট-ল লিঙ্কন’স ইন, যুক্তরাজ্য থেকে পাস করে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ব্যারিস্টার হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্বাক্ষর করেন । তিনি এরশাদের আমলে সমাজ কল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রী ও পরবর্তীতে সংসদ সদস্য  ছিলেন । মেয়ে ব্যারিস্টার শাহানারা ভূঁইয়া (পুষ্প ) এলএলএম ও ব্যারিস্টার এ্যাট-ল (লিঙ্কন’স ইন যুক্তরাজ্য) । ছেলে মাজহারুল হক ভূঁইয়া (রিপন) এমবিএ (লন্ডন) বর্তমানে তিনি ভূঁইয়া একাডেমীর দায়িত্বভার গ্রহন করেন ।

দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব প্রখ্যাত আইনবিদ অবকাশ কালীন সময় কাটাতে ঢাকার অদূরে সোনারগাঁয়ে সাদিপুর ইউনিয়নের নানাখীতে গড়ে তুলেন তাঁর স্বপ্নের সুবিশাল বাগান ‘সামারা ভিলেজ’। মাঝে মধ্যে সময় পেলেই সেখানে চলে যেতেন । তিনি ধানমন্ডির-৭ রোডের ১৩ নম্বর বাড়ী “ল হাউজ”-এ স্থায়ীভাবে বাস করতেন । ২০০৮ সালে ৭ই মে রৌদ্র-ছায়াময় ও সুখ-দুঃখ ঘেরা পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছেন। মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয় স্থান সামারা ভিলেজে তাঁকে চির-নিদ্রায় সমাহিত করা হয়। ইহলোক ছেড়ে অন্যলোকে চলে যাওয়া এই মহান ব্যক্তির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: লোক-সাহিত্যনুরাগী, রাজনীতিক কর্মী ও সংগঠক।

এ জাতীয় আরও খবর

১২৮ দলের বিশ্বকাপও হতে পারে ভবিষ্যতে

নিট আন্দোলন: আলোচনার উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে বলল সিজেপি

তাসনিম জারার তদন্তের দাবি, এমপি গাজী নজরুলের ভিডিও নিয়ে বিতর্ক

২০২৭ সালের হজে বেসরকারি ৩ প্যাকেজ, খরচ কত

টেক্সটাইল খাতের সমস্যা সমাধানে কমিটি গঠন

একনেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার ৮ প্রকল্প অনুমোদন

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী নৌপ্রধানের সাক্ষাৎ

শিক্ষার্থী বিক্ষোভে উত্তাল ভারত, রাহুলের পাঁচ দাবি

আহমদ ছফার দেহাবশেষ স্থানান্তর হলো বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে

ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক আয় আনার নিয়মে বড় সুবিধা

অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দিলেন ৪৭ লাখ করদাতা

এনসিপি নেতাদের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বৈঠক