সোমবার, ২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিনটি ছেলে তাঁর পিছু নিয়েছিল

news-image

অনলাইন ডেস্ক : হ্যাশট্যাগ মি টু (#metoo) তে যৌন নিগ্রহের বেদনাদায়ক অনুভূতি, যা কাউকে এত দিন বলা হয়নি, তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা গণমাধ্যমে তুলে ধরছেন নারী-পুরুষ। এবার নিজের এমন এক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের নিউজডে’র এক উপস্থাপক।

শায়মা খালিল নামের ওই নারী বেড়ে উঠেছিলেন মিসরে। যেখানে প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন মেয়েরা। অথচ প্রতিবাদের বদলে পাশ কাটিয়ে চলে আসায় প্রতিকার বলে মনে করেন সবাই। মনের গভীরে কষ্ট নিয়ে বেড়ে ওঠে কত কিশোরী। নিজের তেমনই এক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন শায়মা। অনেকটা বছর পার হলেও সেই ক্ষত এখনো শুকিয়ে যায়নি। তাঁর বক্তব্যে পুরো লেখাটি তুলে ধরা হল-

১১ বছর বয়সে একটি নির্দিষ্ট দিনের কথা আমার সারা জীবন মনে থাকবে। আমি আমার নানির বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। একদিন প্রথমবারের মত এক বোন ও তাঁর বান্ধবীর সঙ্গে বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাই। আমাদের সঙ্গে কোনো বড় মানুষ থাকবে না। তিনটি কিশোরী একা একা বাইরে যাবে, যা ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিন।

বের হওয়ার আগে আমার নানি কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিলেন, ‘সতর্ক থাকবে, খুব বেশি দূরে যাবে না। আর ফালতু জিনিস কিনে পয়সা খরচ করবে না।’ নানি আসলে আমাদের আইসক্রিম কিনতে বারণ করছিলেন। আমাদের খুব মজা লাগছিল। কারণ আইস ক্রিম তো আমরা খাবই। আমি খুবই উত্তেজিত ছিলাম সেই সঙ্গে কিছুটা ভীতও।

অতঃপর গ্রীষ্মের এক ব্যস্ত দিনে আলেকজান্দ্রার রাস্তায় প্রথম ‘একা’ বের হলো তিন কিশোরী।

হেঁটে যাচ্ছিলাম, বুঝতে পারিনি কেউ আমাদের অনুসরণ করছে। হঠাৎই তিনটি ছেলে আমাদের কাছে এল। তাদের একজন আমাকে জাপটে ধরল। আমি যা করলাম, নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত বোন ও বন্ধুর সঙ্গে হাঁটতে থাকলাম। কিন্তু তারা আমাদের পিছু ছাড়ল না। আমাদের ঠিক পেছনেই তারা আসতে থাকল আর উত্ত্যক্ত করতে থাকল। খুব ভয় লাগছিল সেই সঙ্গে উঠেছিল রাগও। এই তিন অসভ্য ছেলে দিনটিই মাটি করে দিল। এটিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দিন।

আর সহ্য করতে পারলাম না, ঘুরে দাঁড়ালাম এবং চিৎকার কলে বললাম, ‘যথেষ্ট হয়েছে’। তাদের একজন আমার কথার প্রতিধ্বনি করে উপহাস করল। অসম্ভব কষ্ট লেগেছিল।

তবে তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেলাম বাসায় ফিরে। এই ঘটনা জানানোর পর আমার মা রাগে ফেটে পড়লেন। রাগটা ওই ছেলেগুলোর ওপর ছিল না। রাগটা ছিল আমার ওপর। চিৎকার করে তিনি বললেন, ‘তুমি তার সঙ্গে কথা বলেছ? উত্ত্যক্তকারীর সঙ্গে কথা বলা তোমার উচিত হয়নি। তোমার কেবল সরে আসা উচিত ছিল। তুমি কথা বললে, ঝগড়া করলে উত্ত্যক্তকারীরা জিতে যায়।

এক সময় আমার নানিও মায়ের সঙ্গে তাল মেলালেন। বললেন, ‘তুমি চিৎকার করেছ? তুমি কি হেসেছিলে? এ জন্যই তোমাকে তারা হয়রানি করার সুযোগ পেয়েছে।’

আমি মনে করার চেষ্টা করলাম, আমি কি হেসেছিলাম? মনে হয় একবার হাসি পেয়েছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি যৌন হয়রানির শিকার হয়েছি আমার মজাই লাগছিল।

আমার নানি বলেই চললেন, ‘তুমি এত ছোট জামা পড়েছ কেন? জামার হাতা এত ছোট কেন?’

আমি বুঝতেই পারলাম না—পুরো বিষয়টি কেন আমার বিপক্ষে গেল। জীবনে প্রথম একা বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। কয়েকটি ছেলে আমাকে উত্ত্যক্ত করেছে। এত দুঃখ পেয়েছি। অথচ আপনজনেরা আমাকেই দোষারোপ করছে। এটাই আমার জীবনের প্রথম যৌন হয়রানির ঘটনা। তবে এটাই শেষ ছিল না। এর পরে আরও অনেক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি।

এরপর আমার মা আমাকে বুঝিয়ে দিলেন বাইরে বের হলে কোন বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে,

১. এ রকম হয়েই থাকে, এটা খুব স্বাভাবিক
২. কোনোভাবেই হাসবে না।
৩. দ্রুত হেঁটে যাবে, দাঁড়াবে না।
৪. বড় লম্বা জামা পড়তে হবে
৫. এমন কোনো আচরণ করা যাবে না যাতে কোনো রকম মনোযোগ আকর্ষিত হয় তোমার প্রতি।

জীবনে এ নিয়মগুলো আমি পালন করে এসেছি। অনেক সময় কাজে এসেছে অনেক সময় লাগেনি। মিসরে যৌন হয়রানি আমার এবং আমার বন্ধুদের জীবনের একটি অংশ ছিল। নোংরা কথা, আপত্তিকর স্পর্শ, গায়ে হাত দেওয়া, এমনকি জামা টানাটানির মতো ঘটনাগুলো আমাদের জীবনে হর হামেশাই ঘটেছে। এগুলো কিন্তু রাস্তার সাধারণ ছেলেরাই করত। দোকানদার, দারোয়ান, শিক্ষকেরা, সহকর্মী, এমনকি আত্মীয়েরা। তবে কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি মুখ খুলব, প্রকাশ করব এই অন্যায়ের কথা। অন্য সব মিসরীয় নারীদের মত আমরা ভারসাম্য করে চলছিলাম।

২০১৩ সালে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিসরের ৯৯ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে যে কায়রো হল মেয়েদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক মেগাসিটি। তবে ১১ বছরের বয়সের ওই সময়ের চেয়ে এখন দিন অনেক পাল্টেছে। তরুণেরা এখন অনেক বেশি মুখর। যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে প্রচারণা চলছে এবং আইন প্রয়োগকারীরা এটিকে গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছেন। তবে হয়রানি কিন্তু এখনো বন্ধ হয়নি।

আমি এখন মিশরে থাকি না। কিন্তু যখন সেখানে যায় আমি অনেক দুশ্চিন্তা করতে থাকি। আমি এখনো সেই নিয়মের অদৃশ্য বর্মের মধ্যে আছি। এখানে এসে বাইরে বের হলে কাউকে সঙ্গে নিয়ে বের হই।

আমার আট বছরের ভাগনিকে দেখলে আমার নিজের কথা মনে হয়। আমি জানি তাকেও অনেক কিছুর মুখোমুখি হতে হবে। আমি তখন হয়তো তাকে মায়ের সেই নিয়মগুলোই বলব।

কিন্তু আমি মন থেকে কি তা বলতে চাই? আমার বলতে ইচ্ছে করে, ‘তুমি সুন্দর করে থাকবে, হাসবে, মজা করবে, নিজের জীবনকে উপভোগ করবে। আর কোনো জঘন্য মানুষ তোমাকে হয়রানি করলে, চিৎকার করবে, নিজেকে রক্ষা করবে। আর সব সময় মনে রাখবে এটা তোমার কোনো ভুল নয়।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সর্বশেষ ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ ‘মি টু’। সারা বিশ্বের নারী-পুরুষ যারা জীবনের কোনো না কোনো সময় যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন তারা এই হ্যাশট্যাগ নিজেদের সংহতি জানাচ্ছেন। ধর্ষণ সংস্কৃতিকে ঠেকানোর জন্য এই হ্যাশট্যাগ হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন তারা। হলিউড মুঘল ও চলচ্চিত্র প্রযোজক হার্ভে ওয়েনস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহ ও ধর্ষণের অভিযোগের জেরেই এ হ্যাশট্যাগ পোস্ট।

বিবিসি অনলাইন অবলম্বনে

এ জাতীয় আরও খবর

আমড়া খাওয়ার এই উপকারিতাগুলো জানতেন?

কাহানি থ্রি-তে বিদ্যা বালান নয়, মূল চরিত্রে ইয়ামি গৌতম

২০২৬-২৭ অর্থবছর: রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার

সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ সরকার পর্যালোচনা করছে : আইনমন্ত্রী

যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে আহত ২০

কলকাতার ‘পাখি’ এবার ঢাকাই সিনেমার ‘চামেলি’

সৌদিতে এক সপ্তাহে প্রায় ১৫ হাজার অভিবাসী গ্রেপ্তার

স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেল স্ত্রীরও

সাত মাসের মেয়েকে হত্যার মামলায় বাবার ৩ দিনের রিমান্ড

হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু

ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৪৫৮

রেমিট্যান্সে বড় গতি, ২৫ দিনে এলো ২৮ হাজার কোটি টাকা