,

২৮১১ কোটি টাকা ব্যয়ের পর বাতিল হচ্ছে গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প

news-image

অনলাইন ডেস্ক : প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয়ের পর বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। দীর্ঘ ১৪ বছরেও বিশেষ বাসসেবা চালু করতে না পারায় প্রকল্পটির অবকাঠামো সরিয়ে সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

২০১২ সালে প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শেষ করে পরের বছর বিশেষ বাস চালুর পরিকল্পনা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তিন দফা সংশোধনের পর প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রাথমিক বরাদ্দের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকা, যা প্রায় ১০৯ শতাংশ বেশি।

গত রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বিআরটি প্রকল্প বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের চিঠিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক সরিয়ে সড়কটি তিন থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ককে চার লেনে সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানাতে হবে। এরপর কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালে প্রকল্পটির চতুর্থ সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এতে ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত নির্ধারণের পরিকল্পনা ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রস্তাবটি অনুমোদন করেনি। বরং প্রকল্পের বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজা এবং নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

বাস চালু না হওয়ার পেছনে নকশাগত জটিলতা

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উত্তরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত আরেকটি বিআরটি করিডর নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশ চালু না হওয়ায় দ্বিতীয় প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়।

বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা ছিল বাসের দরজার অবস্থান। বাংলাদেশে চলাচলকারী অধিকাংশ বাসের দরজা বাঁ দিকে থাকলেও প্রকল্পের স্টেশনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে ডান পাশে দরজাবিশিষ্ট বাসের উপযোগী করে। ফলে এ ব্যবস্থায় বিশেষ বাস চালু করলেও সেগুলো সাধারণ সড়কে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ত।

অবকাঠামো অপসারণে বাড়তে পারে ব্যয়

প্রকল্পটি বাতিলের ফলে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে নির্মিত স্থাপনা অপসারণ, সড়কের নকশা পরিবর্তন এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ দিতে নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) হিসাব অনুযায়ী, স্টেশন, র‍্যাম্প ও চলন্ত সিঁড়ি অপসারণ এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ দিতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে, বিশেষ বাস কিনে প্রকল্পটি চালু করতে গেলে আরও প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। তবে কোনো স্টেশনের কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। কয়েকটি পদচারী-সেতুতে লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি বসানো হলেও সেগুলোর অনেকগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরেছে, আবার কোথাও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিআরটি লেন আলাদা করতে সড়কের মাঝখানে সিমেন্টের প্রতিবন্ধক ও লোহার বেড়া স্থাপন করায় যানবাহন চলাচলের জায়গাও কমে গেছে। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল সড়ক, আবার কোথাও সরু লেন থাকায় যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে এসব স্থাপনার অনেকগুলোই সরিয়ে ফেলতে হবে।

পরিকল্পনার ঘাটতিতে দীর্ঘ ১৪ বছরের ভোগান্তি

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের একটি দল প্রকল্পটির কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বিআরটি বাতিল এবং বিদ্যমান অবকাঠামোকে উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করেছিল। অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বে দলটি গত বছরের অক্টোবরে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশার ঘাটতি, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার অভাব, বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন সরানোর পরিকল্পনা না থাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নে যুক্ত ছিল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। বিআরটি পরিচালনার জন্য ২০১৩ সালে ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি গঠন করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। বিশেষ বাস চালু না হওয়ায় তাদের কার্যক্রম সীমিত রয়েছে। এখন কোম্পানিটি বিলুপ্ত করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এই সড়ক দিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইলের মানুষ যাতায়াত করেন। নির্মাণকাজ চলাকালে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সাতজনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা নির্মাণকাজের কারণে যানজট ও জনদুর্ভোগ বেড়েছে। এখন অসমাপ্ত স্টেশন অপসারণ, সড়ক পুনর্বিন্যাস এবং উড়ালসড়ক সম্প্রসারণের নতুন কাজ করতে হবে।

প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তে বিআইপির আপত্তি

বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসানের স্বাক্ষরিত ২০ অক্টোবরের প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, মন্ত্রিসভা প্রকল্পটির ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ বিকল্পটি বেছে নিয়েছে।

বিআইপির অভিযোগ, এ সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারকারী ও নির্মাণ খাতের স্বার্থকে বেশি সুবিধা দিয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত রয়েছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।

সংগঠনটির মতে, প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান এবং ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দীর্ঘ ১৪ বছর নির্মাণকাজের কারণে ভোগান্তি পোহানো গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের যাতায়াতের চাহিদাও এ সিদ্ধান্তে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে মনে করছে বিআইপি।

প্রকল্পটিতে ইতোমধ্যে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত বাসসেবা চালু হয়নি। এখন অবকাঠামো সরিয়ে সাধারণ মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন করে ব্যয় ও বাস্তবায়নের সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির পরিকল্পনা, নকশা ও বাস্তবায়নে যেসব ত্রুটি ছিল, সেগুলোর দায় নির্ধারণ এবং

এ জাতীয় আরও খবর

নবীনগরে পুকুরে ডুবে জমজ দুই ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু

বাচসাস নির্বাচন ২০ নভেম্বর

তেহরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করা অত্যন্ত কঠিন: যুক্তরাষ্ট্র

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার-বিরোধী দলের দ্বন্দ্ব তীব্র

ধর্ম আলাদা, পরিচয় এক—আমরা বাংলাদেশি: প্রধানমন্ত্রী

শাহজালালে বসছে অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, বাড়বে নিরাপত্তা

রোনালদোর পেনাল্টি মিস, ফেলিক্সের গোলে রক্ষা

যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁস: বিএআরসির সহকারী পরিচালক গ্রেপ্তার

বার্সেলোনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে পিএসজির দাপুটে জয়

মোদির বাসভবনের কাছে মসজিদ উচ্ছেদের নোটিশ!

টঙ্গীতে গ্যাস বিস্ফোরণে একই পরিবারের ৩ জন দগ্ধ

খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন-লাইসেন্স বাধ্যতামূলক, কার্যকর ১ নভেম্বর