,

কাগজের মূল্যবৃদ্ধি: নতুন বই ছাপা নিয়ে সংশয়

news-image

তাওসিফ মাইমুন : কাগজের দাম বাড়ায় প্রকাশকদের মধ্যে নতুন বই ছাপা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক প্রকাশক অমর একুশে বইমেলা ২০২৩ উপলক্ষে নতুন বই প্রকাশ করছেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। লেখকদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে।

কাগজের দাম বাড়ার ফলে যদি নতুন বই প্রকাশ না পায় তাহলে বাংলা সাহিত্যে তার কতটা প্রভাব পড়বে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অমর একুশে বইমেলা ২০২৩-এ নতুন বই প্রকাশ করতে তাদের দ্বিগুণ খরচ পড়বে। ফলে যতটা না পাঠক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার থেকে বেশি ক্ষতি হবে বাংলা সাহিত্যের।

দেশের বৃহত্তম কাগজের মার্কেট রাজধানীর নয়াবাজার ঘুরে দেখা যায়, গত ছয় মাসে সব ধরনের কাগজের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে পাইকারিতে হোয়াইটপ্রিন্ট প্রতি টন কাগজ ৩৫-৩৭ হাজার টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ২৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়। ছয় মাস আগেও ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় কিনতে পাওয়া যেত। ভালোমানের নিউজপ্রিন্ট এক টন কাগজের দাম বেড়েছে ১৫ হাজার টাকা, যা এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকায়। চার মাস আগেও কিনতে পাওয়া যেত ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকায়।

অনন্যা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মনিরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে কাগজের দাম এতটা বেশি বেড়েছে, যার ফলে অনেক প্রকাশক এবারের অমর একুশে বইমেলায় নতুন বই বের করবেন না। বলা চলে চাহিদার তুলনায় অনেক কম বই বের হবে। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে নতুন বইয়ের কাজ চলে। এর জন্য অনেক কাগজের দরকার পড়ে। চাহিদার বিপরীতে বাজারে প্রচুর কাগজ থাকলেও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ডামাডোলে ব্যবসায়ীরা মজুদ করে দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব যে শুধু প্রকাশকদের ওপর পড়ছে তা নয়, পুরো জাতির ওপর এর বড় প্রভাব পড়বে।’ তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনীতির টানাপড়েন কিংবা যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বই প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ডিসি কাগজের দাম ২৫ শতাংশ দাম বাড়ানো যৌক্তিক ছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সেই কাগজে প্রায় ৮০ শতাংশ দাম বাড়িয়েছে, যা একেবারেই কাম্য নয়। যেহেতু এখনো সময় রয়েছে, তাই আরও ১৫ দিন দেখি। এর মধ্যে প্রকাশকদের জন্য সরকার যদি কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে অমর একুশে বইমেলা ২০২৩-এ ২০ থেকে ২৫টি নতুন বই প্রকাশ করতে পারব।’

সময় প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বই ছাপার জন্য যে কাগজ প্রয়োজন তা এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে বই ছাপার পরিমাণ অনেক কমে যাবে। মেলায় নতুন বই আসবে কি আসবে না, তা নির্ভর করছে কাগজের ওপর।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের অনুমতি নিয়ে মিলাররা কাগজ তৈরির কাজ করছেন। যদি তারা বাজারে কাগজ না ছাড়েন কিংবা বাজার থেকে যদি হঠাৎ কাগজ উধাও হয়ে যায় তাহলে নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের দায়িত্ব। কাগজ ব্যবসায়ীদের মনিটরিংয়ের জন্য রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কাগজ উৎপাদকদের মনিটরিংয়ের জন্য সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় রয়েছে। ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীদের তদারকির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় রয়েছে। ২০২৩-এ বইমেলায় কাগজ সংকটের কারণে যদি নতুন বই না আসে, তাহলে সাহিত্যপাড়ার জন্য তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হবে।’

কাগজের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে লেখকদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, বইমেলা মানেই পাঠকদের মধ্যে নতুন বইয়ের আনন্দ। যদি কাগজের জন্য বই না আসে তাহলে সেই বইমেলা করার মানে নেই। কাগজের দাম বাড়ার ফলে মেলায় যদি নতুন বই না আসে তাহলে জ্ঞানচর্চার ব্যাপক ক্ষতি হবে।

কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একুশে বইমেলা মানেই নতুন বই। মেলায় পাঠকরা এসে আমাদের নতুন বই খুঁজবে। যদি কাগজের মূল্যবৃদ্ধির জন্য বইমেলায় নতুন বই না আসে তাহলে একুশে বইমেলা করার কোনো মানে নেই। কাগজের মূল্যবৃদ্ধির ফলে একেকটি বইয়ের মূল্য তিন-চার গুণ বেড়েছে। এ জন্য অনেক প্রকাশক নতুন বই প্রকাশ করবেন না বলে ঘোষণাও দিয়েছেন। কাগজের মূল্যবৃদ্ধির জন্য ২৫০ টাকার বইয়ের মূল্য ১ হাজার টাকা হলে পাঠকরা বই কিনতে আসবে না।’

তিনি বলেন, ‘যদি এবারে গুরুত্বপূর্ণ বই না বের হয় তাহলে বাংলা সাহিত্য ও পাঠকদের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। পাঠকরা বিমুখ হয়ে পড়বে। পাঠকের কথা চিন্তা করে কাগজের মূল্য কমিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত সরকারের।’

লেখিকা অদিতি ফাল্গুনী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাগজের মূল্যবৃদ্ধির জন্য যে বাজারে নতুন বই আসবে না তা একেবারেই ঠিক নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক লেখক তাদের বইয়ের প্রচ্ছদের ছবি প্রকাশ করে জানান দিয়েছেন যে, এবারের মেলায় তাদের বই আসছে। কাগজের মূল্যবৃদ্ধির জন্য এবারের বইমেলায় নতুন বই আনতে পারছেন না বলে একজন নামকরা প্রকাশককে ঘোষণা দিতে দেখেছি। আবার কিছু বড় প্রকাশনী রয়েছে যাদের প্রচুর পুঁজি রয়েছে, তারা নিশ্চয়ই নতুন বই প্রকাশ করবেন।’

তরুণ লেখকদের অনেকেই মনে করেন, কাগজের মূল্যবৃদ্ধির ফলে শুধু যে প্রকাশনা মালিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তা নয়, এতে শিল্প-সাহিত্যও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে পাঠক কমছে, তার ওপর নতুন করে কাগজের মূল্যবৃদ্ধির জন্য বইয়ের দাম দ্বিগুণ হওয়ার ফলে পাঠক আরও কমবে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১০ বছরের তুলনায় এবার কাগজের দামটা অনেক বেশি। হিসাব করতে গেলে দু-তিন গুণ বেড়েছে। কাগজের মূল্যবৃদ্ধির জন্য যদি নতুন ভালো বই প্রকাশ না পায় তা বাংলা সাহিত্যের জন্য একটা হুমকি হবে। আর সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে নতুন বইয়ের বিকল্প ব্যবস্থা নেই। এ জন্য প্রকাশকদের সুসম্পাদিত বই প্রকাশে উদ্যোগী হতে হবে। শুধু কাগজের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না, বই প্রকাশের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থাটাও গ্রহণ করতে হবে। দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান ই-বুক করে অনলাইনে বই বিক্রি করছে। এই মুহূর্তে সব প্রকাশকের ই-বুকে পথে হাঁটা উচিত বলে মনে করি।’

তিনি বলেন, ‘বাজারে বহু বই বের হয়। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ বইয়ের তালিকার মধ্যে পড়ে না। তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম হচ্ছে আমাদের পাঠক সমাবেশের বইগুলো। অন্যান্য সাধারণ বই থেকে প্রায় দ্বিগুণ সেগুলোর দাম। এরপরও তাদের বই বেশি বিক্রি হয়। কারণ তারা সুসম্পাদিত ও ভালো প্রুফের বই তারা বাজারে আনে। এ জন্য বাংলার সাহিত্য বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের নতুন দিগন্তের পথে হাঁটতে হবে। কাগজের মূল্যবৃদ্ধির বিষয় সরকার কার্যকরী ভূমিকা না নিলে পাঠকদের হাতে তাদের চাহিদার মধ্যে নতুন বই তুলে দেওয়ার সম্ভব নয়। এ জন্য যেন সরকার তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দ্বারা কাগজের মূল্যবৃদ্ধির বিষয় উদঘাটন ও তা কমানোর ব্যবস্থা করে।’

 

এ জাতীয় আরও খবর

বিদায়ি বক্তব্যে কাঁদলেন মির্জা ফখরুল

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১৪ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার

১২ জেলায় ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা

ময়মনসিংহে এনসিসি ব্যাংকের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন ও বৃক্ষবিতরণ অনুষ্ঠিত

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশকে ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের সভা

জিয়া-খালেদার সমাধিতে বিএনপির নতুন ৪ নেতার শ্রদ্ধা

সমাজের সবাই এগিয়ে এলে বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় পতন

রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করতে চাই: মির্জা ফখরুল

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে যা করবেন, যা করবেন না