সোমবার, ২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্ববাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশের গলদা-বাগদা

news-image

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রয়োজনীয় সহায়তা না থাকায় এবং ভেনামি নামের নতুন প্রজাতির চিংড়ির সামনে দাঁড়াতে পারছে না বাংলাদেশের বাগদা ও গলদা চিংড়ি। ইতিমধ্যে ভেনামি চিংড়ি মাছ বিশ্ববাজার দখল করার পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এতে ছিটকে পড়ছে বাংলাদেশের গলদা ও বাগদা চিংড়ি।

পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি ক্রেতাদের মধ্যে প্রথম অবস্থান থেকে আমেরিকা সরে গেছে পঞ্চমে। এতে করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হিমায়িত মৎস্য, কাঁকড়া এবং জীবিত মাছ রপ্তানিতে ধস নেমেছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে। বাকি চার মাসেও লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করা নিয়ে প্রবল সংশয় রয়েছে।

মাছ রফতারিকারকরা দাবি করেছেন, বিদেশে বাজার হারানো, প্রতিযোগী দেশগুলোর বাজার দখল, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতটিতে মারাত্মক রকমের সংকট দেখা দিয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পদস্থ একজন কর্মকর্তা জানান, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হচ্ছে হিমায়িত মৎস্যসহ সী ফুডস রপ্তানি। তৈরি পোশাক শিল্পের পরেই এই খাতের অবস্থান। তৈরি পোশাক শিল্পে অর্জিত হাজার হাজার কোটি টাকা কাপড় এবং এক্সেসরিজসহ ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় বিদেশে চলে যায়। কিন্তু হিমায়িত মৎস্য, কাঁকড়া, সী ফুডস, জীবিত মাছ রপ্তানিসহ এ খাতে অর্জিত পুরো অর্থই দেশে থাকে। এতে করে হিমায়িত মৎস্য খাতকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। কিন্তু এখন খাতটিতে ধস দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মৎস্য উৎপাদনকারী এবং চিংড়ি রপ্তানিতে ১৭ম স্থান অধিকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশী মাছের বিশাল বাজার রয়েছে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে মাছ রপ্তানিতে। বিশেষ করে ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীংলকা, মালদ্বীপ, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনসহ বহু দেশের সাথে নিয়মিত প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশকে বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের কমপক্ষে ৮০টি দেশ মাছ রপ্তানির সাথে জড়িত।

ইতিমধ্যে চিংড়ি রপ্তানিতে বাংলাদেশ বেশ ছিটকে পড়েছে। আমেরিকা ছিল বাংলাদেশের এক নম্বর ক্রেতা। বর্তমানে আমেরিকা পঞ্চম স্থানে চলে গেছে। ভেনামি নামের এক ধরনের চিংড়ি মাছ ইউরোপ আমেরিকার বাজার দখল করেছে। উৎপাদন খরচ কমের কারণে এই মাছের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না বাংলাদেশের বাগদা ও গলদা চিংড়ি। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে নিয়মিত মাছ নিতেন এমন বহু ক্রেতা এখন ভারতীয় রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে ভেনামি চিংড়ি কিনছেন। একই সাথে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, চীনসহ অন্যান্য দেশের বিপুল পরিমাণ চিংড়ি আমেরিকায় রপ্তানি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির চেয়ে ভেনামি চিংড়ির মূল্য পাউন্ড প্রতি প্রায় এক ডলার কম। বাগদা ও গলদা চিংড়ির তুলনায় ভেনামি চিংড়ির উৎপাদন কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচও কম। ফলে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের নানা দেশে বাংলাদেশের চিংড়ি বাজার হারিয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ওই কর্মকর্তা বলেন, ২০০৫ সালে আমেরিকায় ১৬০ মিলিয়ন ডলারের চিংড়ি রপ্তানি হয়েছিল। গত অর্থবছর (২০১৫-২০১৬) তা মাত্র ৪১ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে চিংড়ি রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ৩১ কোটি ৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৩০ কোটি ৫৭ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। যা গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসের তুলনায় ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ কম।

বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া হিমায়িত মৎস্যের ৪৭ শতাংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বেলজিয়াম, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানিতে। এর মধ্যে ২১ শতাংশ রপ্তানি হয় বেলজিয়ামে। ব্রিটেনে যায় ১৩ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসে ৫ শতাংশ এবং জার্মানিতে যায় ৪ শতাংশ। এই বাজারও ইতিমধ্যে হাতছাড়া হতে শুরু করেছে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরের মাছ রপ্তানির সার্বিক চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানিতে আয় হয়েছে ৩৫ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার বা দুই হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। এরমধ্যে শুধু চিংড়ি মাছ রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৩০ কোটি ৫৭ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার বা ২৪২১ কোটি টাকা। যা হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানি আয়ের ৮৫ দশমিক ৪১ শতাংশ।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ৫৩ কোটি ৫৭ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই খাতের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৪ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। প্রথম আট মাসের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এর বিপরীতে এ সময়ে আয় হয়েছে ৩৫ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। যা গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। আগের অর্থবছরে একই সময়ে হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ৩৭ কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার।

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে জীবিত মাছ রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬৫ লাখ মার্কিন ডলার। কিন্তু হিসেব শেষে দেখা যায় মাত্র ৩২ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলারের মাছ রপ্তানি হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫০ দশমিক ৬২ শতাংশ কম। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসের তুলনায় এ খাতের রপ্তানি আয় ৪৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে গেছে। আগের বছরে এ খাতে ৫৭ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল।

হিমায়িত মাছ রপ্তানিতে গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে তিন কোটি ৫৭ লাখ ২০ হাজার ডলার আয় হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের আট মাসের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল তিন কোটি ১২ লাখ ডলার। কিন্তু মাস শেষে দেখা যায় দুই কোটি ৯৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলারের হিমায়িত মৎস্য রপ্তানি হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ দশমিক ০১ শতাংশ কম। এ খাতে আগের বছরের চেয়ে ১৬ দশমিক ১৩ শতাংশ কম রপ্তানি হয়েছে।

মাছ রপ্তানিকারকরা বলেন, বিশ্ববাজারে আমরা বহুমুখী সংকট মোকাবেলা করছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সহায়তা ছাড়া আমাদেরকে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, মাছ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাসহ রপ্তানিকারকেরা বিভিন্ন সংকট মোকাবেলা করছে। এরমধ্যে চলতি মূলধনের অভাব ও ব্যাংকঋণের কড়াকড়ি রপ্তানিকারকদের বেশ ভোগাচ্ছে। সরকারি সহায়তা না পেলে বিশ্ববাজার ক্রমে হাতছাড়া হতে হতে বাংলাদেশ ছিটকে পড়বে বলেও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এ জাতীয় আরও খবর

শেয়ার জালিয়াতির মামলায় আসামি সাহাবুদ্দিন

শাপলা চত্বরে হত্যা মামলায় ৪১ আসামি, তালিকায় হাসিনা-আজিজ-বেনজীর

‘স্পিরিট’-এ দীপিকার বদলে ক্যাটরিনা, বাড়ছে জল্পনা

প্রযুক্তি ও গবেষণায় স্বনির্ভর হতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার

রাজধানীতে আতঙ্ক, সক্রিয় ভাড়াটে খুনিদের তালিকা হালনাগাদ

ঢাকার বায়ুমান আজ সহনীয় পর্যায়ে

থার্ড টার্মিনাল দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে মুখ খুললেন বিমানমন্ত্রী

আন্দোলনে গতি ফেরাতে সক্রিয় হন তারেক রহমান, আসে তিন দাবির আলটিমেটাম

মার্কিন হামলা বন্ধ থাকলে পাল্টা হামলাও বন্ধ রাখবে ইরান

ঢাকায় তাপমাত্রা কমার সম্ভাবনা নেই

সিয়াটলে বন্দুক হামলায় নিহত ২, আটক সন্দেহভাজন

এক বছর পর চালু হলো ঢাকা-নারিতা সরাসরি ফ্লাইট