সোমবার, ২৭শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১২ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভূতের হাসি

news-image

পুরনো এক মন্দির ঘিরে ঘটে চলেছে রহস্যময় সব ঘটনা। ভুতুড়ে আলো, খনখনে হাসি, আর্তচিৎকার। আসলেই কি অলৌকিক কিছুর অস্তিত্ব আছে, নাকি এর পেছনে আছে অন্য কিছু? ট্রেন থেকে নামা দীর্ঘদেহী আগন্তুকই বা কে?  মুকুন্দপুর স্টেশনে এসে দাঁড়াল ট্রেনটা। ট্রেন থেকে নেমে চারপাশে তাকাল দীর্ঘদেহী আগন্তুক। প্ল্যাটফর্মে কোনো লোক নেই। আন্তনগর ট্রেনটা এখানে থামে না। আজ সে আসাতেই থেমেছে। তাই এই স্টেশনে একমাত্র সে-ই নেমেছে। ঘড়ির দিকে তাকাল একবার। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। স্টেশন মাস্টারের কামরাটাতে আলো জ্বলছে। একমুহূর্ত ওদিকে চাইল। এগোতে গিয়েও একটা জিনিস দেখে স্থির হয়ে গেল। একজন লোক এগিয়ে আসছে। স্টেশনের আলো-আঁধারিতে চেহারা পরিষ্কার নয়। তবে একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছে। কাছে আসতেই দেখতে পেল চেহারাটা। বয়স আন্দাজ ৪৫। শক্ত-সমর্থ, চওড়া শরীর। লম্বা সালাম ঠুকে বলল, 'স্যার, আমি কবির। আপনি নিশ্চয়ই ঢাকা থেকে আইছেন। সাহেব আমারে ফোনে কইছে। আমি বাড়ির কেয়ারটেকার, কোনো অসুবিধা হইব না আপনার।' তারপর আগন্তুককে কিছু বলতে না দিয়েই আবার শুরু করল, 'একটু দেরি হইয়া গেল, কিছু মনে কইরেন না। ট্রেনটা এক্কেবারে ঠিক টাইমে চইলা আইব, ভাবতেই পারি নাই। তারপর জোরে পা চালায়ে যে আসমু ওই উপায়ও বন্ধ হইয়া গেছে সেই ছোটকালেই।'

'হ্যাঁ, চলো।' একবার সুযোগ পেয়ে বলল আগন্তুক। লোকটার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। স্টেশন থেকে বের হয়ে দেখল, বাইরে কোনো রিকশা কিংবা ভ্যান নেই। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই কবির বলল, 'স্যার শর্টকাটে বাড়িতে পৌঁছতে মোটে ১০ মিনিট লাগব।' কবিরের পাশে পাশে এগোল দীর্ঘদেহী আগন্তুক। এখানে একটা বিশেষ কাজে এসেছে সে। তবে তার নাম-পরিচয় সব কিছুই গোপন রাখা হয়েছে। মোটামুটি মিনিট ১৫ হাঁটতেই একটা পুরনো দোতলা বাড়ির সামনে চলে এলো দুজন। গেটটা খোলাই ছিল। তাকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল কবির। 'স্যার, আসেন' বলে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল। তাকে অনুসরণ করে দোতলার বেশ বড় একটা ঘরে চলে এলো আগন্তুক। একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এসে লাগল। অনেক দিন ব্যবহার না করলে যা হয়। তবে ঘরটা পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে। খাটটা বিশাল। এ ছাড়া একটা আলমারি, পুরনো দিনের একটা বেতের সোফা আর একটা টেবিল আছে কামরাটিতে। দুই পাশে বিশাল দুটো জানালা। লাগোয়া বাথরুম আছে দেখে আশ্বস্ত হলো আগন্তুক। 'স্যার হাত-মুখ ধুইয়া একটু সাফ হন। ৯টায় খাবার দিয়া দিমু।' এই বলে চলে গেল কেয়ারটেকার কবির। বাড়ির পরিবেশটা ভালো লাগল না আগন্তুকের। এমন খাঁ খাঁ বাড়ি দেখলে মনটা কেমন খারাপ হয়ে যায়। উত্তর দিকের জানালাটা খুলে দিয়ে বাইরে তাকাল। গাছপালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলোয় শ-খানেক গজ দূরের মন্দিরটার আবছা অবয়ব চোখে পড়ছে। পুরনো, ধসে পড়া এই মন্দিরকে ঘিরে যে রহস্য জমাট বেঁধেছে, তার জন্যই তাকে এখানে আসতে হয়েছে।

খেতে গিয়ে বাড়ির আরো দুই সদস্যের সঙ্গে পরিচয় হলো। একজন বছর পঁয়ত্রিশের এক মহিলা। কেয়ারটেকার কবিরের স্ত্রী। বাড়ির রান্নাবান্না সে-ই করে। আরেকজন গার্ড রতন। একুশ-বাইশ বছরের এক তরুণ। মাঝারি উচ্চতা, রোগা শরীর। মন্দিরের ধারের সাদা চুনকাম করা মাটির বাড়িটায় থাকে। বলল, সাধারণত এই বাড়ির মালিক বেড়াতে এলে কিংবা অন্য কোনো মেহমান এলেই তার ডাক পড়ে বেশি। কবিরের স্ত্রীর রান্না ভালো নাকি তার খিদেটাই বেশি পেয়েছে বলতে পারবে না আগন্তুক। তবে মুরগির ঝোল, সবজি আর ডাল দিয়ে খাওয়াটা বেশিই হয়ে গেল। এর মধ্যে রতন শুরু করল গল্প। 'স্যার, মন্দিরটা দেখছেন তো। রাত্রিরে ওইখানে শুরু হয় তাণ্ডব। লাল-নীল-সবুজ আলোয় ভইরা যায় চারপাশ। আর কে জানি পাগলের মতো হাসতে থাকে, কখনো কান্দে, গোঙায়। লোকে বলে ডাইনি বুড়ি। এমনিতে মন্দিরটা ভাইঙা পড়ছে অনেক আগে। সাপখোপের ভয়ে লোকজন কাছ মাড়াইত না। এখন এই নতুন উপদ্রবে মানুষ পারলে এই এলাকা থেইকাই ভাগে।'

'কতক্ষণ চলে এটা?'

'শুরু হয় এই ধরেন পৌনে ১১টার দিকে। কোনো কোনো দিন এক ঘণ্টা, এমনকি দেড় ঘণ্টা ধইরাও চলতে থাকে।' উত্তর দিল রতন। তারপর বলল 'কবির ভাইয়ের সাহস অনেক। এগুলানরে কেয়ার করে না। কিন্তু আমার আবার ভয় বেশি। যতক্ষণ এসব চলে, দোর আটকাইয়া ঘরের মধ্যে পইড়া থাকি আমি আর আমার মা। আমার ঘর থেকেও মন্দির দেখা যায়। কিন্তু ওদিকে তাকাই না একবারও।'

উত্তরের জানালা খোলাই ছিল। হঠাৎ নীল-লাল নানা ধরনের আলো পড়তে থাকল মন্দিরের গায়ে। আর তার পরই শুরু হলো খনখনে এক হাসি। চলতেই থাকল হাসিটা। কখনো এক মুহূর্ত ছেদ টেনে আবার শুরু হয় বিকট এই হাসি। একটু পর শুরু হলো ভয়ানক একটা গোঙানি। গাটা কেমন শিরশির করে ওঠল আগন্তুকের। তার পরই হাসি ভেদ করে আরেকটা আওয়াজ শোনা গেল। ঢাকার দিকের রাতের ট্রেন আসছে। আলোর খেলা আর অদ্ভুতুড়ে হাসি শেষ হলো সাড়ে ১২টা নাগাদ। আজ চলেছে পৌনে দুই ঘণ্টা। বিছনায় এসে গা লাগানোর সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমে ঢলে পড়ল আগন্তুক।

সকাল ৮টায় নাশতা সেরে এলাকাটা ঘুরে দেখতে বেরোল। ১৪-১৫ বছরের একটা ছেলের সঙ্গে দেখা পথে। ক্লাস নাইনে পড়ে, নাম টুপু। ওর সঙ্গে আলাপ জমে গেল। ছেলেটাকে নিয়েই মন্দিরের দিকে এগোল। পথেই দেখা হলো ইয়া লম্বা এক তালপাতার সেপাইয়ের সঙ্গে। কমসে কম ছয় ফুট তিন ইঞ্চি হবে লোকটা। তবে গায়ে হাড়ই বেশি। ওদের দেখেও না দেখার ভান করে চলে গেল। 'ও রানা। ভালো ছাত্র ছিল। কিন্তু পড়ালেখা শেষ করে নাই। ঢাকাতে দোকান ছিল ইলেকট্রনিকসের। কিন্তু অনেক দিন ধরে বাড়িতেই থাকে। কী করে কে জানে। আগে অনেক ভালো ছেলে ছিল, এখন আমাদের মতো ছোট ছেলেপুলে দেখলেই বকাঝকা করে।' মন্দিরটার কাছে এসে আবিষ্কার করল, চারপাশে গাছপালা, ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে অনেকটাই। মন্দিরের ১০০ গজ পরেই কাঁটাতারের বেড়া।

'ওপাশে কি ভারত?'

'হ্যাঁ। এখান থেকেই সীমানা শুরু। তবে এদিকটায় এখন আর ভারতের বিএসএফও ভিড়ে না। মন্দিরের এই ভৌতিক কাহিনী মনে হয় ওরাও জানে।' টুপুকে সঙ্গে নিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার কাছ পর্যন্ত গেল লোকটা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখল। তারপর আবার ফিরে চলল। বাড়ির গেটেই পেল কবিরকে। বলল, 'স্যার, মন্দিরের দিকে গেছলেন নাকি? বাইরের মানুষ ওদিকে না যাওনই ভালো। কখন কী ঘইটা যায়!'

দুপুরের নাশতা খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার বেরোল। স্টেশনে গিয়ে স্টেশন মাস্টারের কাছে কিছু খবর নিল। ফিরতি পথে দেখা হলো বেশ বয়স্ক একজন লোকের সঙ্গে। সালাম দিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে আগন্তুক জবাব দিল, 'অনেক দিন গ্রামে ঘুরতে আসি না। তাই আমার এক বন্ধুর বাড়ি পড়ে আছে শুনে দিনকয়েকের জন্য হাওয়া বদলাতে এসেছি।'

জবাবে মুচকি হাসি দিয়ে বুড়ো লোকটা বলল, 'বাবা, আমি হাই স্কুলের হেড মাস্টার ছিলাম। রিটায়ার্ড করেছি। তবে মাথা এখনো কাজ করে। তুমি কিছু একটা লুকাচ্ছ, অনুমান করছি। তবে এটাও জানি, তুমি খারাপ মানুষ না। অনেক কিছুই দেখি। তবে এলাকায় থাকতে হয়, তাই মুখ বুজে থাকি। তবে মনে রাখবে, আশপাশে সবাই শত্রু। আর এলাকায় চোরাচালান বাড়ছে। ট্রেনের দিকে নজর রাখবে।'

রাত ৯টায় খেতে বসতেই শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। খাওয়া শেষ করে যখন ওপরে ওঠল, তখনো অবিরাম ধারা ঝরছে। এক ঘণ্টা টানা বর্ষণের পর থামল আকাশের কান্না। তবে একটু পর পর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ১১টার দিকে শুরু হলো মন্দিরের আলোর খেলা, সেই সঙ্গে খনখনে গলার কান্না। বিদ্যুৎ চমকাতেই মন্দির আর আশপাশের চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একবার বিদ্যুৎ চমকাতেই সাদা চুনকাম করা বাড়িটার থেকে একটা ছায়ামূর্তি বের হয়েই ছায়ায় মিলিয়ে যেতে দেখল।

আজ ট্রেন লেট। এলো ১২টায়। ভৌতিক কাণ্ডকারখানা তখনো চলছে। হঠাৎ গায়ে একটা কালো শার্ট চাপিয়ে বের হয়ে এলো আগন্তুক। বাড়ির পাশে কেয়ারটেকারের কামরা শুনশান মনে হলো। নিশ্চয়ই এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। গ্রামের মানুষের তাড়াতাড়ি ঘুমানো আর ওঠা অভ্যাস। মন্দিরের কাছাকাছি যখন এলো, তখন হঠাৎই থেমে গেল আলোর খেলা। এক মুহূর্ত পরেই বন্ধ হলো ভুতুড়ে কান্নার শব্দও। মন্দিরের ধারে একটা ঝোপের মধ্যে নড়াচড়া হলো, তারপর দৌড়ানোর শব্দ। অন্ধকারে পুরোপুরি ঠাহর করা গেল না। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে হাত থেকে টর্চটা গেল পড়ে। ওটা উঠিয়ে মন্দিরে পৌঁছতে পৌঁছতে লোকটা হাওয়া। পাঁচ সেলের টর্চটা ধরল মন্দিরের দিকে। ঘুরে চারপাশ দেখতে লাগল। মন্দিরের পেছন দিকে মাটি থেকে প্রায় সাত হাত মতো ওপরে একটা গর্ত চোখে পড়ল। নিচে এসে এক জোড়া পায়ের দাগ চোখে পড়ল। খুপরিটা এমনিতে নাগাল পাওয়া সম্ভব না তার পক্ষে। কাছ থেকে ভেঙে পড়া বড় একটা পাথর এনে ওটার ওপর দাঁড়িয়ে ভেতরে হাত ঢোকাতেই বুঝল খালি। তবে এখানে একটা কিছু রাখা হয়। ভাগ্য ভালো, অনুমানটা সঠিক ছিল। যদি সাপখোপ থাকত?

ছুটতে শুরু করল কাঁটাতারের বেড়ার দিকে। এখানেও কাউকে পেল না। এবার একেবারে কাঁটাতারের বেড়ার গা ঘেঁষে এসে দাঁড়াতেই দেখল, একটা জায়গা ভাঙা। এখান দিয়ে চাইলেই জিনিসপত্র আদান-প্রদান করা যায়। কেউ এসেছিল বৃষ্টির পর। প্রমাণ, দুই জোড়া পায়ের ছাপ। এক জোড়া ছাপের একটা খুব গভীরভাবে বসে গেছে কাদামাটিতে, তবে আরেকটা ছাপ তুলনামূলক হালকা। যখন বাড়ির কাছাকাছি এলো, তখন রাতের ট্রেন ছাড়ার শব্দ শুনল। আজ মনে হয়, ট্রেনে যায়নি চালান, মনে মনে ভাবল আগন্তুক। সে এসে বাগড়া দিয়ে ফেলেছে লোকগুলোর পরিকল্পনায়। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফোন করল থানায়।

রাতে ধরা পড়ল চোরাচালানের নায়করা। দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে মন্দিরের দিকে তাকিয়ে আছে আগন্তুক, মানে গোয়েন্দা রবিন হাসান। মুখে তৃপ্তির হাসি, আরেকটি রহস্যের সফল সমাপ্তি ঘটানোর আনন্দে। পাঠক, বলুন তো চোরাচালানের সঙ্গে কে কে জড়িত? গোয়েন্দা কিভাবে তাদের শনাক্ত করল? মন্দিরে ভুতুড়ে কাণ্ডকীর্তির রহস্য কী? 

এ জাতীয় আরও খবর

আমড়া খাওয়ার এই উপকারিতাগুলো জানতেন?

কাহানি থ্রি-তে বিদ্যা বালান নয়, মূল চরিত্রে ইয়ামি গৌতম

২০২৬-২৭ অর্থবছর: রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার

সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ সরকার পর্যালোচনা করছে : আইনমন্ত্রী

যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে আহত ২০

কলকাতার ‘পাখি’ এবার ঢাকাই সিনেমার ‘চামেলি’

সৌদিতে এক সপ্তাহে প্রায় ১৫ হাজার অভিবাসী গ্রেপ্তার

স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেল স্ত্রীরও

সাত মাসের মেয়েকে হত্যার মামলায় বাবার ৩ দিনের রিমান্ড

হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু

ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৪৫৮

রেমিট্যান্সে বড় গতি, ২৫ দিনে এলো ২৮ হাজার কোটি টাকা