রবিবার, ২৬শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাপানে ‘মৃতদের হোটেল’!

news-image

জাপানের ওসাকার বাসিন্দা সুমিকো। কফিনের মধ্যে বেশ আরাম করে শুয়ে আছেন তিনি। সুন্দর পোশাক পরিধান করে সুসজ্জিত কফিনে শুয়ে থাকা সুমিকোকে মৃত ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ তিনি নিজের মৃত্যুর আগেই কফিনের সাইজ, রং ইত্যাদি বিষয় ঠিক করছেন, যাতে মৃত্যুর পর অন্যের ইচ্ছেয় তার শেষকৃত্য না হয়। যদি ভেবে থাকেন অন্যান্য জাপানি বাসিন্দাদের তুলনায় সুমিকো একটু ব্যতিক্রম তাহলে কিঞ্চিত ভুল করবেন। দেশটির প্রায় অধিকাংশ নাগরিকই নিজের মৃত্যু পরবর্তী আচারাদি পালন নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন। কিন্তু কেন এই উদ্বিগ্ন অবস্থা।

গত বছরের এক হিসেব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে জাপানে আনুমানিক দেড় মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক মৃতের মধ্যে অধিকাংশই বয়স্ক। ধারণা করা হচ্ছে ২০৪২ সাল নাগাদ এই মৃত্যুহার ক্রমশ বাড়তে থাকবে। তবে মৃত্যুহার বৃদ্ধির চেয়েও অন্য যে বিষয়টি জাপানবাসীকে সঙ্কটে ফেলেছে তা হলো, কবর দেয়ার জায়গার অভাব। ভুমিকম্প প্রবন অঞ্চল হওয়ায় যত্রতত্র কবর খোড়া যায় না দেশটিতে। তারউপর সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট স্থানের বাইরেও দেয়া যায় না। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, শিন্টো রীতিতে একটি কবরের উপর আর কোনোদিন অন্য কোনো কবর দেয়া যায় না, অন্তত জ্ঞানত। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী অন্তেষ্ট্রিক্রিয়া পদ্ধতিও বেশ ব্যয়বহুল, যা এখন গড়পড়তা জাপানিদের পক্ষে মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।

ইয়োকোহামা শহরতলীর সারিবদ্ধ নুডুলসের দোকানগুলো পেড়িয়ে একটু সামনে আগালেই নজরে আসবে একটি সাদা আর ধূসর রঙের দালান। এধরনের দালানগুলোকে জাপানে সচরাচর ‘লাভ বিল্ডিং’ বলা হয়। কিন্তু হিশায়োশি তেরামুরার এই দালনটি মোটেও লাভ বিল্ডিং নয়, এটা একটি ‘মৃতদের হোটেল’। ‘আমার এই হোটেলে কেউ আসলে আমি তাদের বলি যে, আমার এখানে শুধু শীতল রুমই আছে’-তেরামুরা। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে বার হাজার টাকার বিনিময়ে একজন মানুষ কবরের শীতল অনভূতি পেতে পারবেন তেরামুরার হোটেলে।

শুধু তাই নয়, সরকারি স্থানে মৃতদের কবর দিতে গেলে দীর্ঘদিন লাইনে থাকতে হয়। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত মৃতদেহকে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয় না, কিছুদিন গেলেই পচণ শুরু হয়ে যায়। এমতাবস্থায় তেরামুরার হোটেলটি একটি বিচিত্র সুবিধা দিয়ে থাকে তার খদ্দেরদের। খদ্দেররা চাইলে নির্দিষ্ট পরিমান অর্থের বিনিময়ে মৃতদেহকে এই হোটেলের শীতল ঘরে রাখতে পারেন। আবার যখন লাশ কবর দেয়ার সিরিয়াল চলে আসে, তখন এই হোটেল থেকে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ায় যায়।

শুধু তেরামুরাই নয়, জাপানে দিনকে দিন মৃতদেহের এই বাণিজ্য ব্যাপক জনপ্রিয় হচ্ছে। প্রতিদিনই শহরগুলোতে নতুন করে হোটেল খোলা হচ্ছে খদ্দেরদের চাপ সামলাতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে জাপানে গড়ে মৃতের হার হবে দেড় মিলিয়নের বেশি। আর তখন জাপানের জনসংখ্যা দাড়াতে পারে বিশ মিলিয়নে। তাই যদি হয়, তাহলে আগামী ২০৪০ সাল পর্যন্ত জাপানে মৃতদেহ নিয়ে বাণিজ্য একটি লাভবান ব্যবসা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।

অবশ্য জাপানে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে থেকেই কবরস্থান বাণিজ্য চলে আসছিল। তেরামুরা, আয়নের মতো রিটেইল চেইনগুলো দেশের বড় বড় কৃষকদের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করেছে বাণিজ্যের স্বার্থে। কিন্তু কবরস্থান বাণিজ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা সর্বপ্রথম তেরামুরার মাথাতেই আসে। তিনিই প্রথম মৃতদের হোটেল স্থাপন করেন এবং অন্যান্যদের উৎসাহিত করেন।

এ জাতীয় আরও খবর