,

নূর হোসেনের রহস্যময় হাসিতে অজানা আতংক

news-image

 সিদ্ধিরগঞ্জে একসময়ের মুকুটহীন সম্রাট সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন শুধু একটি রহস্যময় হাসি দিয়েই সাধারণ মানুষের মনে এক অজানা আতংক ছড়িয়ে দিয়েছেন। দীর্ঘ ১৯ মাস পর নারায়ণগঞ্জের মাটিতে পা দিয়ে আদালত থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে চলে গেলেও এক ধরনের আতংকে ভুগছেন মামলার বাদীসহ নিহতের স্বজনরা।
এদিকে নূর হোসেনের বিশাল সাম্রাজ্যের আসল নিয়ন্ত্রক কে তা নিয়ে রয়েছে ধোয়াঁশা। তবে নূর হোসেনের বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা বাণিজ্য তারই এক সময়ের সহযোগীরা দখল নিয়ে পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে। আলোচিত ওই খুনের ঘটনার পর নূর হোসেন ও তার বাহিনীর সকলেই আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় একাধিক গ্রুপের দখলে চলে যায় তার অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য। গত এপ্রিলে সাত খুনের মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করার পর ফিরতে শুরু করে নূর হোসেনের সহযোগীরা।


বিশেষ করে নূরকে দেশে ফিরিয়ে আনার পরপরই তার ক্যাডারদের অনেকেই প্রকাশ্যে আসায় এই আতংকের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি তাদের কয়েকজনকে শুক্রবার আদালত প্রাঙ্গণেও দেখা গেছে। শুধু তাই নয়, সাত খুন মামলার চার্জশিটভুক্ত আরেক পলাতক আসামি নূরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কিলার সেলিমও সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থান করছেন। নূর হোসেনের সঙ্গেই তিনি (সেলিম) ভারতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। পরে জামিন পেয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন।


এলাকাবাসী ও নিহতদের স্বজনরা এসব তথ্য জানিয়েছেন। সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গ্রেফতারের পর ভারতের কারাগারে বসেই সিদ্ধিরগঞ্জের হারানো সাম্রাজ্য দখলে নিতে ছক আঁকছিলেন একসময়ে ওই এলাকার মুকুটহীন সম্রাট নূর হোসেন। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর এরই মধ্যে এলাকায় ফিরে এসেছেন আপন ভাইসহ নূর বাহিনীর কমপক্ষে অর্ধশত ক্যাডার। এলাকার ডিস ক্যাবল ব্যবসার আধিপত্য নিতে এরই মধ্যে নূর হোসেনের আপন ভাতিজা কাউন্সিলর শাহজালাল বাদলের বাহিনী এলাকায় নানা তৎপরতা শুরু করেছে।
ফের তারা দখলে নেয় হারানো ব্যবসা-বাণিজ্যের অধিকার। শিমরাইল মোড়, ট্রাকস্ট্যান্ড, বাসস্ট্যান্ড, ট্যাক্সি ও মাইক্রোস্ট্যান্ড, সিদ্ধিরগঞ্জ হাউজিং, কাঁচপুর সেতুর নিচের বালুমহাল, সিদ্ধিরগঞ্জ পুলসংলগ্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র, আদমজী ইপিজেড, মেঘনা ও পদ্মা ডিপোসহ সকল সেক্টর নূর হোসেনের অনুসারীদের দখলে রয়েছে।


জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের অবৈধ ব্যবসা থেকে প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা আদায় করতেন নূর হোসেন। তিনি ভারতে পালালে তারা অনুসারীরা এগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এদিকে, ভারত থেকে নূর হোসেনকে ফেরত আনার পর তার বাহিনীর কেউ কেউ এলাকায় অবস্থান করলেও বেশিরভাগই পালিয়ে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছে বলে একাধিক সহযোগী জানিয়েছেন।
জানা যায়, সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড় ও বাসস্ট্যান্ড নূর হোসেনের উপদেষ্টা খ্যাত সাদেকুর রহমান ও আব্দুস সামাদ বেপারী নিয়ন্ত্রণ করে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী সকল যানবাহন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা আদায় করে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৮টি গ্রুপ। গত সেপ্টেম্বর মাসে এদের সঙ্গে যোগ দেয় নূর হোসেনের ভাতিজা শাহজালাল বাদল।
শিমরাইলের ট্রাক ট্রার্মিনালটিও নূর হোসেনের ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে। এখানে দৈনিক ট্রাক প্রতি ৩শ’ টাকা হারে চাঁদা আদায় করছে তার ভাই জজ মিয়া। গত সেপ্টেম্বর মাসে এলাকায় এসে ট্রাক টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নেয় জজ মিয়া বাহিনী।
শিমরাইল মোড়ের সিংহভাগ আয় আসত মাদক থেকে। নূর হোসেন পালিয়ে গেলে মাদক ব্যবসা কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকে। অবশ্য এর কিছু দিন পরই তার সহযোগীরা এলাকায় ফিরতে শুরু করলে আস্তে আস্তে মাদকের ব্যবসা প্রসারিত হতে থাকে। এখন তা জজ মিয়া ও শাহজালাল বাদল পরিচালনা করছেন।


সাত খুনের ঘটনার পর শিমরাইল মোড়ে উচ্ছেদ অভিযানের কারণে ট্যাক্সি ও মাইক্রোস্ট্যান্ড ছিলো না। পরবর্তীতে মনির বাহিনী ডিএনডি খাল ভরাট করে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড দখল করলেও বর্তমানে এটি সাত খুন মামলার এজাহার থেকে বাদ পড়া নূর হোসেনের সহযোগী আমিনুল হক রাজু ও সালাউদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে। দৈনিক প্রতি ট্যাক্সি বা মাইক্রো থেকে ৮শ’ টাকা হারে লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে।


শীতলক্ষ্যা নদীর তীর দখলে রেখে অবৈধ বালু ব্যবসা সরকার বন্ধ করতে পারলেও বর্তমানে নদীর তীরের মাটি কেটে বিক্রি করছে একটি মহল। এখানেও জজ মিয়া ও আরিফুল হক হাসানের হাত রয়েছে।
এদিকে, নূর হোসেনের ২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে আরিফ হাসান তার অবৈধ কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। নূর হোসেনের নির্দেশে নূর হোসেনের স্ত্রী রুমাসহ অন্যান্য ভাই ও তাদের স্ত্রীরা আরিফের পক্ষে ভোট চেয়ে এলাকায় প্রচারণা চালায়।
শিমরাইলস্থ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ করত নূর হোসেনের ভাই নূরুদ্দিন। তার আত্মগোপনের পর নজরুলের শ্বশুর শহিদ চেয়ারম্যান এটি নিয়ন্ত্রণ করত। পরবর্তীতে নূরুদ্দিন এলাকায় ফিরে এলে সড়ক ও জনপথের বিভাগীয় অফিস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।


সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও আদমজী ইপিজেড এলাকা নূর হোসেন ও মতিউর রহমান মতির নিয়ন্ত্রণে ছিল। নূর হোসেন ভারত পালালে এগুলো দখলে নেয় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের সভাপতি মতি। তার বাহিনীর দখলে পদ্মা, মেঘনা তেলের ডিপো ও সরকারি জমি।


এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, গত দেড় বছরে আমরা বেশ শান্তিতেই ছিলাম। 
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পরিত্যক্ত কোনো মিলে রাতভর কোনো মানুষের আর্তনাদ শোনা যেত না কিংবা বহুতল ভবন নির্মাণ করতে ভয় পেতেন না এলাকার লোকজন। ট্রাক স্ট্যান্ডে কাউন্টার বসিয়ে মাদকের ব্যবসা ছিল না, ছিল না পরিবহনে ওপেন চাঁদাবাজি। ওই নেতা জানান, চলতি মাসেই এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নূর হোসেনের ভাতিজা (স্থানীয় কাউন্সিলর) শাহজালাল বাদল অপর এক আওয়ামী লীগ নেতার ওপর হামলা চালিয়েছেন। এই ঘটনায় মামলার পরও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাদল।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেছেন, নূর হোসেনের একসময়ের ঘনিষ্ঠ এসব সহযোগী এলাকায় ফিরে বেহাত হয়ে যাওয়া অবৈধ সাম্রাজ্য দখল ও পরিবহন সেক্টরসহ বিভিন্ন চাঁদাবাজির উৎস নিয়ন্ত্রণ নিতে পাঁয়তারা শুরু করেছেন। এলাকাবাসীর দাবি, এসব সন্ত্রাসী মাঝেমধ্যেই এলাকায় মহড়া দিয়ে আতংক সৃষ্টি করছে।


এ ব্যাপারে সাত খুন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মামুনুর রশীদ ম-ল বলেন, নূর হোসেনের ভাইয়েরা এলাকায় ফিরেছে কিনা এমন কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। তবে তারা তো আর মামলার আসামি নয়। যদি স্থানীয় থানায় কোনো মামলা থেকে থাকে তবে সেটা ওই থানাকে বলেন। নূর হোসেনের ভাই ও ক্যাডারদের এলাকায় ফিরে আসার ব্যাপারে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি সরাফত হোসেন জানান, মামলা থাকলে এলাকায় ফিরে আসার প্রশ্নই আসে না। আর যদি কেউ মামলা মাথায় নিয়ে এলাকায় আসে বা আইন-শৃংখলার অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করে তবে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।


এদিকে সাত খুন মামলার চার্জশিট থেকে এজাহারভূক্ত আসামি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন মিয়া, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আমিনুল হক রাজু, হাসমত আলী হাসু, আনোয়ার হোসেন আশিক ও ইকবাল হোসেন বাদ পড়লে তারা এলাকায় এসে ফের পূর্বের অপকর্মে লিপ্ত হয়েছেন।
এই ইয়াছিন মিয়াকে থানা আওয়ামী লীগের কমিটি থেকে বাদ দেয়া হলেও গত সেপ্টেম্বরে তিনি বর্ধিত সভা করে পুনরায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল হন। এরপর থেকে ইয়াছিন মিয়া ও তার বাহিনী সিদ্ধিরগঞ্জ ও শিমরাইল মোড়ের বিভিন্ন স্থানে চাঁদা আদায়সহ নানা অপকর্ম করে যাচ্ছে। গতকাল এ প্রসঙ্গে ইয়াছিন বলেন, নূর হোসেনের সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। এর বাইরে কোন সম্পর্ক নেই। তিনি জনগণের সেবার জন্য রাজনীতি এবং ব্যবসা করেন বলে জানান। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয় বলেও দাবি করেন।
 

এ জাতীয় আরও খবর

শেখ হাসিনা কালকেই আসুন, হাতকড়া দিয়ে রিসিভ করব: বিমানমন্ত্রী

নির্যাতনের অভিযোগে দাম্পত্যে ইতি, থানায় সমঝোতায় সংগীতশিল্পী কনটেন্ট ক্রিয়েটর ইউসুফ রায়হান ও মুন্নির বিবাহ বিচ্ছেদ

আজ প্রথম প্রেম মনে করার দিন

বিশ্ব বাঁশ দিবস আজ

মূল্যস্ফীতি কমার প্রভাব নেই বাজারে

কয়েক দোকান ঘুরেও মিলছে না সয়াবিন তেল

পাত্তাই পেল না শ্রীলঙ্কা, বড় জয়ে সিরিজ নিশ্চিত করল ইংল্যান্ড

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাহিন্দ্রা ও সিএনজিকে ধাক্কা দিয়ে উল্টে গেল বাস, নিহত ২

ডিবি হেফাজতে ক্যান্টনমেন্ট থানার সেই ওসি

সারাদেশে একযোগে ৯৯ জন বিচারক বদলি

ছুটির দিনে সকালে ‘অস্বাস্থ্যকর’ ঢাকার বাতাস

ডিমের দাম ডজনে কমেছে ১০ টাকা, স্বস্তি ফেরেনি মাছ-মুরগিতে