ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোটারদের রায়, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে ডেমোক্র্যাটরা

news-image

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টি। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। বিপরীতে দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি।

নির্বাচনের ফলাফলকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও শাসনব্যবস্থার প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

দীর্ঘদিন রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও এবার বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। কানসাসে প্রায় এক শতাব্দী পর ডেমোক্র্যাটিক পার্টি থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে সাউথ ক্যারোলাইনায় ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া প্রার্থীও পরাজিত হয়েছেন।

টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। রাজ্যটিতে সিনেট আসন জয়ের পাশাপাশি গভর্নর পদেও রিপাবলিকানদের পরাজিত করেছে দলটি। এতে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান আধিপত্যে বড় পরিবর্তন এসেছে।

নির্বাচনের ফলাফলে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে যাচ্ছে। আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হলে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তদন্তের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন ও সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা বাড়বে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় প্রেসিডেন্টের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর নিয়োগ আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও পাবে দলটি। এমনকি সুপ্রিম কোর্টে বিচারকের পদ শূন্য হলে নতুন মনোনয়ন অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নির্বাচনে সাফল্যের পর ডেমোক্র্যাটদের সিনেট নেতা চাক শুমার বলেন, সিনেটের রাজনৈতিক মানচিত্রে এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। ভোটাররা পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন, এখন সেই প্রত্যাশা পূরণ করাই দলের দায়িত্ব।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে ২০২৮ সালের নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য নেতৃত্ব ও উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হতে পারে। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে ২০২০ সালের নির্বাচনের মতো এবার ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেননি ট্রাম্প। বরং ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন জানিয়েছেন তিনি। অভিবাসনসহ কয়েকটি বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করলেও নিজেদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, এমন কোনো বিল পাস হলে তাতে ভেটো দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

নির্বাচনে কেন পিছিয়ে পড়ল রিপাবলিকানরা

পুরো নির্বাচনী প্রচারণায় ডেমোক্র্যাটদের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি দুর্নীতি এবং ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্পের উচ্চ শুল্কনীতি ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাবে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে।

অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ট্রান্সজেন্ডার অধিকারসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইস্যুকে সামনে রেখে প্রচারণা চালায়। তবে নির্বাচনী জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক বিতর্কের চেয়ে অর্থনৈতিক সংকট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

রয়টার্স ও ইউএসএ টুডের ভোট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ১ হাজার ৭০০ কাউন্টির মধ্যে অল্প কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশ এলাকাতেই রিপাবলিকানরা সমর্থন হারিয়েছে। ধনী-দরিদ্র, উচ্চশিক্ষিত কিংবা তুলনামূলক কম শিক্ষিত—বিভিন্ন শ্রেণির ভোটারের মধ্যেই ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেড়েছে। বিশেষ করে ল্যাটিনো অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে দলটির অগ্রগতি ছিল উল্লেখযোগ্য।

কানসাসের সিওয়ার্ড কাউন্টিতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টন বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে ১৩ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে থেকে পরাজিত করেছেন। অথচ ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একই কাউন্টিতে ট্রাম্প ৩৯ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন।

প্রতিনিধি পরিষদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ২০টি আসনের সবকটিতেই জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে নিজেদের নির্বাচনী সুবিধা বাড়াতে রিপাবলিকানদের নেওয়া কয়েকটি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগও প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।

ট্রাম্পের সমর্থিত প্রার্থীরাও পরাজিত

মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ট্রাম্পও নির্বাচনী প্রচারণায় নিজেকে সামনে রেখেছিলেন। শেষ কয়েক সপ্তাহে একাধিক সমাবেশে অংশ নিয়ে সমর্থকদের তাঁকে ব্যালটে থাকা প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

বিভিন্ন রাজ্যে নিজের পছন্দের প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েও নির্বাচনী ফলাফলে সুবিধা করতে পারেননি তিনি। টেক্সাসে বর্তমান সিনেটর জন কর্নিনের পরিবর্তে স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু প্যাক্সটন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।

সাউথ ক্যারোলাইনায় সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তাঁর বোন ডারলিন গ্রাহামকে সমর্থন দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনিও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজের কাছে হেরে গেছেন।

এমনকি ট্রাম্পের নীতি থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করা রিপাবলিকান প্রার্থীরাও ভোটারদের অসন্তোষ এড়াতে পারেননি। মেইনে দীর্ঘ ৩০ বছরের সিনেট ক্যারিয়ারের অবসান ঘটেছে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের।

মার্কিন সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য

এবারের নির্বাচনে মিশিগান থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

নির্বাচনে ট্রাম্প-সমর্থিত সাবেক কংগ্রেস সদস্য ও এফবিআই কর্মকর্তা মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন তিনি। প্রচারণার সময় রজার্স তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয় চরমপন্থার অভিযোগ তুলে প্রচার চালিয়েছিলেন।

জয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশে এল-সায়েদ বলেন, প্রতিপক্ষ ঘৃণার রাজনীতিকে বেছে নিয়েছিল, কিন্তু মিশিগানের মানুষ আশার পথ বেছে নিয়েছেন।

ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষের প্রতিফলন বুথফেরত জরিপে

নির্বাচনের রাতে একের পর এক রাজ্যে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের খবর আসতে থাকলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, নিজে নির্বাচনে প্রার্থী থাকলে রিপাবলিকানরা বড় ব্যবধানে জয়ী হতো।

তবে বুথফেরত জরিপে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের জন্য পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ভোটার ট্রাম্পের নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ভোট দিয়েছেন। প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটার দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ বা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এ ছাড়া জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে কংগ্রেসে শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি প্রয়োজন।

জয়ের পর জর্জিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ বলেন, মার্কিন জনগণ তাদের ভোটের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি, দুর্নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

নির্বাচনে একাধিক ঐতিহাসিক অর্জন

এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কিশা ল্যান্স বটমস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন।

ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান প্রার্থী বায়রন ডোনাল্ডস জয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান গভর্নর হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন।

এ ছাড়া টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা প্রথম ল্যাটিনা গভর্নর এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় জেভিয়ার বেসেরা প্রথম ল্যাটিনো গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে আগামী দুই বছর ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, নীতি বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে।

এ জাতীয় আরও খবর

‘সাধারণ শ্রমিক এমন তাণ্ডব চালাতে পারে না’, বললেন রাশেদ খান

তাহসিফ হত্যা মামলায় দিশার দ্বিতীয় দফায় রিমান্ড

৩৫ বছরেই চলে গেলেন গায়িকা নিকোল টেলর

হরমুজে বাংলাদেশি জাহাজের নিরাপদ চলাচলে পাশে থাকবে ইরান

ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ ধারণায় বদলেছে ম্যাট ডেমনের কাজের ধরন

স্বর্ণের দামে বড় লাফ, ভরিতে বাড়ল ৩৩২৪ টাকা

৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবসে সরকারের নানা আয়োজন

বুড়িমারী সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ব্যর্থ

ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীকে হারিয়ে কংগ্রেসে পিয়া ডান্ডিয়া

সিনেট হারাল ট্রাম্পের দল, নিয়ন্ত্রণে ডেমোক্র্যাটরা

মিরপুরে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ মোতায়েন

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সহায়তা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান