,

মূল্যস্ফীতি কমার প্রভাব নেই বাজারে

news-image

সরকারি খাতা-কলমে মূল্যস্ফীতি কমার যে চিত্র দেখানো হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তব জীবনের খরচের কোনো মিল নেই। অন্যদিকে টিসিবির হিসাবে কিছু পণ্যের দাম কমলেও সাধারণ ভোক্তারা বাজারে তার সুফল পাচ্ছেন না। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এমন অভিযোগ সাধারণ ভোক্তা ও বাজারসংশ্লিষ্টদের।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, সরকারি হিসাবে যেসব পণ্যের দাম কমার কথা বলেছে, বাজারে দেখা যায়–বেড়েছে। আবার বিবিএস জানাচ্ছে মূল্যস্ফীতি কমেছে। অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় মিটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

এনবিআরে সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোকবলের অভাবে বাজারের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে অনেক দিনের অভিযোগ আছে। শুধু বাজারের তথ্যই না, দেশে কোন পণ্যের কতটা মজুত আছে, আপৎকালীন সার, গ্যাস কতটা মজুত আছে তাও জানা যায় না।

তিনি বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাস্তবের সঙ্গে কাগজের তথ্যের মিল পাওয়া যায় না। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি তার আগের মাসের তুলনায় কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়। গত আগস্ট মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮.২৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি বিগত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন মূল্যস্ফীতি। আগস্ট মাসের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.০২ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ৭.১৬ শতাংশ।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাজারদরের সঙ্গে তার আগের বছরের একই সময়ের বাজারদরের তুলনা করে টিসিবি জানিয়েছে, প্রতি কেজি সরু চাল ৩.১৩ শতাংশ, মাঝারি চাল ৭.৬৯ শতাংশ এবং মোটা চাল ৮.৭০ শতাংশ হারে কমেছে। মসুরের ডাল বড় দানারটা প্রতি কেজি ৭.৩২ শতাংশ এবং মাঝারি দানারটা ৬ শতাংশ হারে কমেছে। ছোট দানার মসুরের ডালের দাম একই আছে। প্রতি কেজি অ্যাঙ্কর ডাল ৩.৫৭ শতাংশ এবং ছোলা মানভেদে ২.৩৩ শতাংশ হারে কমেছে। একইভাবে দেশি পেঁয়াজ ৩০ শতাংশ, রসুন ৮.৩৩ শতাংশ এবং হলুদ ৪.২৯ শতাংশ হারে কমেছে।

অন্যদিকে টিসিবির হিসাবে সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, পেঁয়াজ (দেশি), রসুন (দেশি ও আমদানি), কাঁচা মরিচ, বেগুন, শসার দাম বাড়ার কথা বলেছে। তবে টিসিবি যে হারে বাড়ার কথা বলছে, দাম তার চেয়ে বেশি বেড়েছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলেছেন, বাজারে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সিন্ডিকেটের প্রভাব কমছে না। এতে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের ব্যবধান কমানোও সম্ভব হচ্ছে না।

বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে তথ্য নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামের ব্যবধান কমছে না। পাইকারি বাজারে কোনো পণ্যের দাম সামান্য কমলেও খুচরা বিক্রেতারা নানা অজুহাতে বেশি দামেই পণ্য বিক্রি করছেন। পরিবহন ও অতিরিক্ত খরচও পণ্যের মূল্য বাড়ার অন্যতম কারণ। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পণ্য পরিবহনে বাড়তি ভাড়া এবং বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত চাঁদা আদায়ের কারণে খুচরা বাজারে এসে পণ্যের দাম আর কমে না।

দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বাজার তদারকির অভাব ও কৃত্রিমসংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে, উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়মিত ও কঠোর বাজার নজরদারি না থাকায় বিক্রেতারা নিজেদের ইচ্ছামতো চড়া দামে পণ্য বিক্রি করছেন। অনেক সময় বড় বড় সিন্ডিকেট বা অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্য মজুত করে কৃত্রিমসংকট তৈরি করে রাখেন। এতে সরবরাহ বাড়লেও দাম কমে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, পরিসংখ্যানে যা দেখানো হয়, বাজারে গিয়ে তার প্রতিফলন পাওয়া যায় না। মূল্যস্ফীতি কমার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় মিটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, গত বছরের তুলনায় মানুষের আয় যতটা বেড়েছে, তার তুলনায় জিনিসপত্রের দাম বেশি বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষ অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগাড় করতেই ভোগান্তিতে পড়ছেন।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, আগের মতোই অধিকাংশ পণ্য চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি সরু চাল ৭৫-৮০ টাকা, মাঝারি চাল ৫৫-৬০ এবং মোটা চাল ৫০-৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় দানার মসুরের ডাল ৮২ টাকা, মাঝারি দানার এই ডাল ১৩৫ ও ছোট দানার মসুরের ডাল ১৫৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। এ ছাড়া অ্যাঙ্কর ডাল প্রতি কেজি ৬০ টাকা, ছোলা ১০০-১১০ টাকায় বিক্রি হয়।

স্বস্তি নেই মসলার বাজারেও। জিরার কেজি ৬০০-৬৫০ টাকা, ধনে ২৬০ টাকা, দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকায়, আলু ২৫-৪০ টাকা, রসুন ১৫০- ১৮০ টাকা, আদা ১৬০-১৭০ টাকা ও গোটা হলুদ ৩৫০-৪০০ টাকায়। এ ছাড়া বোতলজাত সয়াবিন তেল ২০৪ টাকা লিটার, পাম অয়েল ১৮৬ টাকা কেজি, কাঁচা মরিচ ১৬০-২০০ টাকা, বেগুন ১০০-১৬০ টাকা, শসা ৭০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মিরপুর ৬ নম্বরে বাজার করতে আসা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শামসুর নাহার বলেন, সংবাদমাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন রিপোর্টে পণ্যের দাম বাড়া-কমার তথ্য জানতে পারি। কিন্তু বাজার করতে এসে ওই সব রিপোর্টের সঙ্গে কোনো মিল পাই না। আমরা জানি, সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে কতটা চাপে আছে।

এই বাজারের আরেক ক্রেতা বেসরকারি চাকরিজীবী আবদুর রউফ বলেন, নতুন পে-স্কেলের খবরে সব কিছুর দাম বেড়েছে। আমাদের জীবনযাত্রার মধ্যে খাবারের খরচ বড় বিষয়।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে মাছ, মাংসের বাজারও চড়া দেখা গেছে। গরুর মাংস ৭৮০-৮০০ টাকা কেজি, খাসির মাংস ১২৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৮০-১৯০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩০০-৩৩০ টাকা, ডিমের ডজন ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের মাছের মধ্যে ইলিশের কেজি ২৪০০-২৬০০ টাকা, জাটকাও ১০০০-১৫০০ টাকা, পাঙাশ ২৮০-৩০০ টাকা, তেলাপিয়া ২৮০-৩২০ টাকা, ট্যাংরা ৬০০-৯০০, পাবদা ৪০০-৬০০, চিংড়ি ৭০০-১৪০০ টাকা কেজি বিক্রি করতে দেখা যায়। এ ছাড়া ডানো দুধও ৯৫০ টাকার কম পাওয়া যায় না। আরও দেখা যায় একই পণ্য বাজারভেদে ১০-২০ টাকা পর্যন্ত কম-বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

এ জাতীয় আরও খবর