যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে ধস
অনলাইন ডেস্ক : চলতি বছরের প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ রপ্তানিকারক হিসেবে ভিয়েতনাম প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। অবস্থান আরও সুসংহত করেছে দেশটি। বিপরীত চিত্র বাংলাদেশের।
বিশ্বের ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান কিছুটা দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ, প্রধান প্রতিযোগী কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এই সময়ে।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে মাত্র তিনটি দেশ- কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম।
বিপরীতে বাংলাদেশসহ চীন, ভারত, পাকিস্তান, মেক্সিকো ও হন্ডুরাসের রপ্তানি কমেছে। বাংলাদেশের পতন চীন ও ভারতের তুলনায় অনেক কম হলেও প্রতিযোগী কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতার চাপ আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চলমান বৈশ্বিক ট্যারিফ উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও রপ্তানিকারকরা।
সতর্ক বার্তা দিয়ে তারা বলেন, বাংলাদেশের জন্য এই ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি অশনিসংকেত। প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অংশীদারত্ব বাড়াচ্ছে, তখন বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাস অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে নিম্নমুখী প্রবণতা আরও প্রকট হতে পারে।
রপ্তানির চিত্র
বুধবার (৫ আগস্ট) প্রকাশিত ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ কমে ৩৫ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৩৮ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার।
প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়া সবচেয়ে ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। দেশটির রপ্তানি ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ভিয়েতনাম ১ দশমিক ০৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে ৭ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, ফলে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে গত বছর রপ্তানি আয় ছিল ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে চীনের। দেশটির রপ্তানি ৩৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ভারতের রপ্তানি ২৫ দশমিক ২৭ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
এছাড়া মেক্সিকোর রপ্তানি ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারে, হন্ডুরাসের রপ্তানি ৯ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে ৯৮৬ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন ডলার থেকে ৮৯৬ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলারে এবং পাকিস্তানের রপ্তানি ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
যে কারণে পতন
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক চাহিদার দুর্বলতা, চলমান শুল্ক (ট্যারিফ) অনিশ্চয়তা এবং ক্রেতাদের সতর্ক ক্রয়নীতির প্রভাব রয়েছে।’
বাংলাদেশের জন্য শুধু রপ্তানি কমেছে- এটি দেখলেই হবে না। একই সময়ে প্রতিযোগী দেশগুলো কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে, সেটিও বিশ্লেষণ করা জরুরি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য শুধু রপ্তানি কমেছে- এটি দেখলেই হবে না। একই সময়ে প্রতিযোগী দেশগুলো কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে, সেটিও বিশ্লেষণ করা জরুরি। বাজারের চাহিদার পরিবর্তন, মূল্য প্রতিযোগিতা, ক্রেতাদের সোর্সিং কৌশল ও সরবরাহ সক্ষমতার মতো বিষয়গুলো এখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’
তার মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার হওয়ায় সেখানে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি উদ্বেগের বিষয়। প্রতিযোগী দেশগুলো যখন বাজার হিস্যা বাড়াচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য উৎপাদন সক্ষমতা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, পণ্য বৈচিত্র্য ও ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার ওপর আরও জোর দিতে হবে। অন্যথায় আগামী মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্বের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।’
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, ক্রেতাদের সতর্ক অবস্থান ও বাড়তে থাকা মূল্যচাপ বড় ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হওয়ায় সেখানে চাহিদার যে কোনো নেতিবাচক পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি দেশের পোশাক খাতে পড়ে।’
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এবং ক্রেতারা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হয়ে উঠেছেন বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘অনেক ক্রেতা বড় পরিমাণের অর্ডারের পরিবর্তে ছোট ও স্বল্পমেয়াদি অর্ডার দিচ্ছেন। একই সঙ্গে পণ্যের দাম কমানোর জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছেন, যা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ওপর দ্বিমুখী চাপ সৃষ্টি করছে।’
হাতেম বলেন, ‘শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতিই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে। উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিযোগিতামূলক মূল্য দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি খাতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তারই প্রতিফলন।’
বৈশ্বিক পোশাক বাজারে চাহিদার ধীরগতি, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ক্রেতাদের সতর্ক সোর্সিং কৌশল বাংলাদেশের রপ্তানিতে প্রভাব ফেলছে জানিয়ে বলেন, ‘একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও অন্য খরচের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতার কারণে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ- দুই ধরনের চাপের সম্মিলিত প্রভাবই বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে দেখা যাচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
উৎপাদন ব্যয় কমানো, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করা, সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানো ও পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিসহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি বলেও পরামর্শ দেন এ অর্থনীতিবিদ।
রপ্তানি ঘুরে দাঁড়াতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, ‘উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যবসা পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা দূর করা ও রপ্তানিকারকদের জন্য নীতিসহায়তা বাড়ানো জরুরি।’
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি ও ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে জানান তিনি।
হাতেম আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের কৌশল গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব আরও চাপে পড়তে পারে।











