,

বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিযোগিতা

news-image

নিউজ ডেস্ক : মূল্যস্ফীতির চাপে এমনিতেই বিপর্যস্ত জীবন। এরই মধ্যে কিছু সুযোগসন্ধানী অসাধু ব্যবসায়ী পকেট কাটছে ক্রেতাদের। পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও অস্বাভাবিকভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন তারা। ভোক্তাদের জিম্মি করতে তৈরি করা হচ্ছে পণ্যের কৃত্রিম সংকটও। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ও পরিবহন খরচ, সরবরাহে ঘাটতি- নানা অজুহাতে অতি অল্পসময়ে অনৈতিকভাবে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিতে মরিয়া এ ধরনের ব্যবসায়ী। সুযোগ

নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরাও। সর্বশেষ জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে পোয়াবারো হয়েছে এদের। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, বাজারকাঠামোর ওপর যার প্রভাব যত বেশি তিনি তত বেশি দাম বাড়াচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদা-জোগানের সূত্র মেনে নয়, বাজারে পণ্যের দাম ওঠানামা করছে সিন্ডিকেটের ইশারায়। বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নজরদারির ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে অসাধুরা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন খরচের দোহাই দিয়ে পণ্যমূল্য অতিরিক্ত বাড়ানো হচ্ছে। এখন দেশে যেন দাম বাড়ানোর অসুস্থ এক প্রতিযোগিতা চলছে। এর ফল- ডিমের দাম কয়েক দিনেই আকাশচুম্বী, ব্রয়লার মুরগি এখন আর সহজলভ্য নয়, ভালো ফলনের পরেও চালের দামে আগুন, সরকারের সিদ্ধান্তের আগেই বেড়ে গেছে চিনির দাম, সয়াবিন তেলের বোতলে আবারও সংকট, সস্তার সবজি কিনতেও বেজায় অস্বস্তি হচ্ছে ভোক্তার। ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ থেকে শুরু করে অন্যান্য পণ্যের দামেও আগুন।

বাজার তদারকিতে বাণিজ্য, খাদ্য, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সরকারের নানা সংস্থা কাজ করলেও তাদের সার্বিক কাজে সমন্বয়হীনতার চিত্রই বারবার সামনে আসছে। কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার ফাঁক গলে ঘুরেফিরে সেই পুরনো সিন্ডিকেটের কারসাজিরই জয় হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রতিযোগিতা কমিশন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আরও কার্যকর হতে হবে। আমরা দেখি, প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থাপনার জায়গায় এক ধরনের সিন্ডিকেটভিত্তিক বাজার পরিচালনার প্রবণতা রয়েছে। আমদানি পর্যায়ে বেশকিছু প্রয়োজনীয় পণ্যে আমরা সিন্ডিকেশন দেখি। সেখানে নতুনদের প্রবেশে কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কিনা খতিয়ে দেখা উচিত। আমদানি থেকে ভোক্তাপর্যায়ে বাজার ব্যবস্থাপনায় কোনো কারসাজি কিংবা ব্যবসায়ীদের আঁতাত আছে কি না সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশে উৎপাদিত পণ্যের বিতরণের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে হবে। পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমিতি রয়েছে যেগুলো প্রভাব খাটিয়ে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। এটা ভোক্তা অধিকার পরিপন্থী। এগুলোও বন্ধ করতে হবে।

বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকিতে আইন থাকলেও তা প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে ড. মোস্তাফিজ বলেন, আমাদের আইন রয়েছে, সেগুলো প্রয়োগে শৈথিল্যও রয়েছে। একটা প্রতিষ্ঠান ১০ বার কারসাজি করে একবার ধরা পড়ছে। ওই প্রতিষ্ঠান দশবারে যা মুনাফা করে তার তুলনায় একবারের জরিমানা অনেক কম। এভাবেই তারা পার পেয়ে যাচ্ছে।

খুব অল্পসময়ে অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় সম্প্রতি ডিম ও ব্রয়লার মুরগি নিয়ে কারসাজির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ১২০ টাকা ডজন বিক্রি হওয়া ফার্মের মুরগির ডিমের দাম খুব অল্প সময়ে ১৬০ টাকায় পৌঁছায়। পাল্লা দিয়ে ব্রয়লার মুরগির দামও ১৫০-১৫৫ টাকা থেকে লাফিয়ে বেড়ে ২০০ টাকাতেও বিক্রি হয়। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানেও উঠে এসেছে কারসাজির তথ্য। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ডিম ও মুরগির পাইকারি ও খুচরা দোকানে অভিযান চালায় সংস্থাটি।

ডিমের বাজারে অভিযান চালিয়ে হতবাক হতে হয়েছে জানিয়ে ভোক্তা অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের অফিসপ্রধান মো. আবদুল জব্বার ম-ল আমাদের সময়কে বলেন, কোথাও কোনো শৃঙ্খলা নেই। কোন পর্যায়ে ডিমের ক্রয়মূল্য কত, তা কেউ জানেনই না। রসিদ থাকলেও মূল্যের জায়গা ফাঁকা। আরও অবাক হতে হয়েছে এই শুনে- ক্রয়মূল্য কত সেটার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ডিম ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের নির্ধারণ করা দামেই ডিম কেনাবেচা হয়। খোদ ডিম ব্যবসায়ী সমিতির কাছ থেকেই এমন তথ্য পাওয়া গেছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিজেই বলছেন; ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে নয় বরং চাহিদা ও বাজার অনুযায়ী ডিমের দাম নির্ধারণ করে দেন তারা। এভাবেই চলছে। মুরগির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এসব অনিয়ম ঠেকাতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হচ্ছে।

এগ প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি তাহের আহমেদ সিদ্দিকী জানান, স্থানীয় পাইকার ও ডিম ব্যবসায়ী সমিতিগুলো বিশেষ কৌশলে ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণ করেন। খামারে প্রতি পিস ডিমের দাম কমবেশি এক টাকা বেড়েছে। অথচ বাজারে ৫ টাকার বেশি বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগির বাজারেও এমনটি চলছে বলে জানান বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সদস্য নজরুল ইসলাম।

এদিকে একের পর এক ভালো ফলনের পরেও বেশি দামে কিনে খেতে হচ্ছে চাল। সরকারের আমদানির সিদ্ধান্তেও সুফল মেলেনি। উল্টো জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে চালের কেজিতে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। চালের বাজারে অভিযান চালানো হলে আড়ত ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। অভিযান শেষে আবারও চলছে চালবাজি।

কারওয়ান বাজারের রনি রাইস এজেন্সির ব্যবসায়ী মো. মনিরুল ইসলাম জনি জানান, এ বাজারের বেশির ভাগ চাল মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট থেকে আসে। সেখানে সকালে এক দাম, বিকালে আরেক দাম। এমনও হয় যে, ফোনে বুকিং দিয়ে আনতে গেলে বলা হয়- চাল নেই। পরদিন সেই চালই বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়াতে পরিবহন খরচ বেড়েছে ঠিকই। কিন্তু খুচরায় কেজিতে দাম ১ টাকা বাড়ার কথা, সেখানে বেড়েছে ৪-৫ টাকা।

শ্যামবাজারের মিতালী আড়তের ব্যবসায়ী কানাই সাহা বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পাবনা থেকে এক বস্তা (৭০ কেজি) পেঁয়াজের ভাড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়েছে। এতে পাইকারিতে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ১ টাকারও কম। অথচ হাত বদল হয়ে খুচরা বাজারে ৫ টাকারও বেশি বেড়ে গেছে।

বাজার তদারিকতেই গলদ রয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান। তিনি বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ কিংবা খুচরাবাজারে তদারকি অভিযান চালিয়ে কোনো ফল পাওয়া যায় না। এগুলো অনর্থক, অকার্যকর পদক্ষেপ। এতে শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় না। সরকারের কাছে পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের প্রকৃত পরিসংখ্যানই নেই। এগুলোর পরিষ্কার তথ্য থাকতে হবে। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। চাহিদা ও সরবরাহের হিসাব মনিটরিং করাই হচ্ছে আসল মনিটরিং। বাজার-বাজার ঘুরে কয়েকটা ব্যবসায়ীকে জরিমানা করাটা মনিটরিং নয়।

এদিকে সরকারের কাছে চিনির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে রিফাইনারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু সরকার কোন সিদ্ধান্ত জানানোর আগেই খোলা ও প্যাকেট চিনির দাম কেজিপ্রতি অন্তত ৫ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে সয়াবিন তেলের দামও বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো। সরকার এ নিয়ে সিদ্ধান্ত দেয়নি। তবে এরই মধ্যে পুরনো কৌশল নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ কমিয়ে বাজারে বোতলজাত তেলের সংকট তৈরি করা হয়েছে। তেলের খোঁজে ভোক্তাকে দোকান থেকে দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। লাফিয়ে বাড়ছে অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর দামও।

পণ্যের সরবরাহ না বাড়িয়ে যতই মূল্য নির্ধারণ ও তদারকি অভিযান চালানো হোক না কেন দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে না বলে মনে করেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। তিনি বলেন, পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিকল্প নেই। সরবরাহ স্বাভাবিকের কাছাকাছি থাকলে দামও সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলে ভালো। পণ্য আমদানিতে সরকার শুল্ক ছাড় দিলে তার সুবিধা ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছেছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাজার সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। তা না হলে যতই উদ্যোগ নেওয়া হোক সুফল মিলবে না।

এ জাতীয় আরও খবর

বিদায়ি বক্তব্যে কাঁদলেন মির্জা ফখরুল

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১৪ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার

১২ জেলায় ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা

ময়মনসিংহে এনসিসি ব্যাংকের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন ও বৃক্ষবিতরণ অনুষ্ঠিত

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশকে ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের সভা

জিয়া-খালেদার সমাধিতে বিএনপির নতুন ৪ নেতার শ্রদ্ধা

সমাজের সবাই এগিয়ে এলে বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় পতন

রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করতে চাই: মির্জা ফখরুল

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে যা করবেন, যা করবেন না