,

গরম-লোডশেডিংয়ে মরছে মুরগি, পথে বসছেন খামারিরা

news-image

পাবনা প্রতিনিধি : তীব্র তাপপ্রবাহ। তার ওপর টানা পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টার লোডশেডিং। ঘরের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাবে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট ও হিটস্ট্রোকসহ নানা কারণে নিমিষেই নেতিয়ে পড়ে মারা যাচ্ছে আড়াই কেজি বা তার চেয়ে বেশি ওজনের মুরগিগুলো। এভাবেই মারা গেছে শতাধিক মুরগী। এমনই ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার ঈশ্বরদীর বড়ইচড়া গ্রামের ব্রয়লার মুরগির খামারি আবু রায়হান।

তিনি জানান, টানা গরমে গত বুধবার এবং তার আগের দুদিনে যথাক্রমে ৭, ৫ ও ৬টি করে মুরগি মারা গেছে। এভাবে গত ৮-১০ দিনে হিটস্ট্রোক ও গরমে তার খামারের মোট ১২০টি মুরগি মারা যায়। গড়ে আড়াই কেজি ওজনের মোট ৩০০ কেজি মুরগি মারা যাওয়ায় এক ধাক্কায়ই সাড়ে ৪৬ হাজার টাকার লোকসান গুনেছেন তিনি।

রায়হান বলছেন, প্রতিদিন এমন মৃত্যুর মিছিল দেখে আতঙ্কে গত বৃহস্পতিবার খামারের বাকি সব মুরগি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছি।বিদ্যুৎ স্বাভাবিক না হলে আর নতুন করে মুরগি তোলা যাবে না।

আবু রায়হানের এই আকুতি কোনো একক ঘটনা নয়; বরং পুরো পাবনা জেলা জুড়েই এখন পোল্ট্রি খামারিদের ঘরে ঘরে একই হাহাকার। লাগামহীন খাদ্য-ওষুধের দাম এবং একের পর এক সংক্রামক রোগের ধাক্কা সামলাতে এমনিতেই নাভিশ্বাস উঠছিলো খামারিদের। এর ওপর নতুন বিপদ হিসেবে যুক্ত হওয়া তীব্র লোডশেডিং যেন তাদের পুরোপুরি সর্বস্বান্ত করার চরম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই-তিন বছরে দফায় দফায় পোল্ট্রি ফিড, বাচ্চা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ভ্যাকসিনের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। দুই-তিন বছর আগে যে ফিডের দাম ছিল ২৪০০ টাকা, তা বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৩৪০০ টাকায়। ওষুধেও বেড়েছে সমপরিমাণ খরচ।

এছাড়া উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মাঝেও প্রায়ই রানীক্ষেতসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব লেগে থাকে। এসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে খামারিরা যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই টানা লোডশেডিং তাদের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিচ্ছে।

ব্যাহত ডিম-মাংসের উৎপাদন, বন্ধ হচ্ছে খামার
পোল্ট্রি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির খাদ্য ও পানি সরবরাহ, সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। সেটি না পেলে বাতাসে অক্সিজেনের অভাবে মুরগির শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং আকস্মিক হিটস্ট্রোকে মারা যায়। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর বা আইপিএস ব্যবহার করতে গিয়ে খামারিদের উৎপাদন খরচ আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

পাবনা জেলা পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আকমল জানান, জেনারেটর চালাতে ঘণ্টায় ২০০ টাকা হারে দিনে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক প্রান্তিক খামারি নির্ধারিত সময়ের আগেই কম দামে মুরগি বিক্রি করে দিচ্ছেন, কেউবা খামার বন্ধই করে দিচ্ছেন।

পাবনা সদর উপজেলার মালিগাছা ইউনিয়নের মাহমুদপুর বাজারের লেয়ার খামারি ওয়াসিমের খামারে ৩ হাজার ৩০০ মুরগির মধ্যে এখন টিকে আছে মাত্র হাজার খানেক। খামারের দায়িত্বে থাকা নাজমুল জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে মুরগি খাবার কম খাচ্ছে, রোগবালাই বাড়ছে এবং ডিমের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এক হাজার মুরগি থেকে আগে দিনে ৩২-৩৫ খাঁচি ডিম পাওয়া গেলেও এখন তা নেমেছে ২৪-২৬ খাঁচিতে। লোকসান এড়াতে মহাজন ২২০০-২৪০০ মুরগি কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এক্ষেত্রেও ৫০০-৫৫০ টাকার মুরগিতে দাম মিলেছে মাত্র ৩৫০-৪০০ টাকা।

হেমায়েতপুর ইউনিয়নের শানিকদিয়ার এলাকার নাজমা বেগম জানান, গরম আর রোগবালাইয়ের কারণে ২৮ দিনে ৩৬০টি মুরগির মধ্যে তার ১০০টি বড় মুরগি মারা গেছে। এতে তার লোকসান হয়েছে ৩০-৪০ হাজার টাকা। দেনা মেটাতে এক কিস্তির ওপর আরেক কিস্তি তুলতে হচ্ছে তাকে।

পাঁচ বছরে বন্ধ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ খামার
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে লেয়ার খামার রয়েছে ১৪২১টি, ব্রয়লার ১০১৮টি এবং সোনালি মুরগির খামার রয়েছে ৬০৪টি। অর্থাৎ জেলায় সর্বমোট ৩০৪৩টি মুরগির খামার চালু আছে। অথচ মাত্র পাঁচ বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজারের কাছাকাছি। নানামুখী সংকটে ক্রমাগত লোকসানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ খামার ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।

খামারিদের দাবি, পোল্ট্রি খাতকে বাঁচাতে হলে এখনই বিদ্যুৎ সরবরাহে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি খাদ্য ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি তদারকি এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা না করলে দেশের ডিম ও মাংসের বাজারে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে।

যা বলছে কর্তৃপক্ষ
পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ১-এর জেনারেল ম্যানেজার আবদুল্লাহ আল আমীন চৌধুরী জানান, গত কয়েকদিনের গরমে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৭০-৭৫ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে ২৫-৩০ শতাংশ লোডশেডিং দিতে হয়েছিল। তবে বৃহস্পতিবার থেকে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় সংকট কেটেছে বলে দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জহুরুল ইসলাম জানান, গরমে হিটস্ট্রোক থেকে বাঁচাতে খামারিদের স্যালাইন ও বিটেইন জাতীয় ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সরকার পোল্ট্রি খাতে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে এবং খাদ্য-ওষুধেও ভর্তুকির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। এসব সহায়তা দ্রুত বাস্তবায়ন হলে খামারিরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এ জাতীয় আরও খবর

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সংসদে বিশেষ অধিবেশন চায় জামায়াত, রাষ্ট্রপতিকে চিঠি

শুভ্রতার আভায় সাদিয়া

রানির মুকুটে নতুন পালক

নির্ধারিত সময়ের পরও খোলা দোকানপাট ও শপিং মল

রাজধানীতে সিএনজি সংকট: ৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মিলছে অর্ধেক সিলিন্ডার গ্যাস

সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেব না : নাহিদ ইসলাম

হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করলে তারেক রহমান ভারত সফর করবেন না

নিম-করলা-জামের রস নিয়ে যা জানা জরুরি

নতুন রাষ্ট্রপতিকে শপথ পাঠ করাবেন কে?

হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু

যশোরে পুকুরে ডুবে প্রাণ গেল ৩ শিশুর

মেজাজ হারিয়ে মিরাজকে স্টার্ক বললেন— ‘তুমি কিন্তু বাংলাদেশে নেই’