,

ছাড়ের পরও লাফিয়ে বাড়ছে খেলাপি ঋণ

news-image

জিয়াদুল ইসলাম : কিস্তি পরিশোধে ছাড় সুবিধা অব্যাহত রাখার মধ্যেই খেলাপি ঋণ নবায়নে ফের ঢালাও সুবিধা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পরও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। কোনোভাবেই এর লাগাম টানা যাচ্ছে না।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এ তিন মাসে নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। এর আগের তিন মাসে বেড়েছিল প্রায় ১১ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় অযোগ্য মন্দমানে পরিণত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৮৮ শতাংশের চেয়েও বেশি। চলতি বছর ২০২২ সালের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ১২২ কোটি টাকা।

শুধু পরিমাণের দিক থেকেই নয়, শতাংশ হিসাবেও এ সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে জানা গেছে। গত জুনে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর চেয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির গতি বেশি। সম্প্রতি ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

মহামারী করোনা পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার পর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব, দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সৃষ্ট বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চলতি বছরও ঋণের কিস্তি পরিশোধে ছাড় সুবিধা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব ঋণ গত ১ এপ্রিল নিয়মিত ছিল, শুধু সেসব ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে জুন, সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বর প্রান্তিকে বড় ঋণের বিপরীতে যে পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করার কথা, তা যথাক্রমে তার ৫০, ৬০ ও ৭৫ শতাংশ পরিশোধ করলে ঋণগুলো আর খেলাপি হবে না। আর কৃষি ও সিএমএসএমই ঋণে যে পরিমাণ পরিশোধ করার কথা, তার ২৫, ৩০ ও ৪০ শতাংশ পরিশোধ করে খেলাপিমুক্ত থাকা যাবে। এ ছাড়ের মধ্যেই খেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিলে আবার ঢালাও ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব সুবিধা এবং ছাড় দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণ না কমে উল্টো বাড়ছে।

এর আগে ২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনার আঘাত আসার পর ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে ব্যবসায়ীদের স্বল্পসুদে প্রণোদনার ঋণ দিয়ে সহযোগিতার পাশাপাশি ওই বছরজুড়েই ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। ফলে ওই বছর বকেয়া ঋণের কোনো কিস্তি পরিশোধ না করেও কেউ খেলাপি হননি। ২০২১ সালে এ সুবিধা বহাল রাখা না হলেও ঋণ পরিশোধে ছাড় অব্যাহত রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই বছর বকেয়ার ঋণের মাত্র ১৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধে করলেই খেলাপিমুক্ত থাকার সুযোগ দেওয়া হয়।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি হঠাৎ করে সৃষ্ট কোনো সমস্যা নয়, দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা সমস্যারই ধারাবাহিকতা। কারণ কয়েক বছর ধরে প্রতি প্রান্তিকেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। অথচ এ সময়ে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠনসহ সব ধরনের সুবিধার দরজা উন্মুক্ত করা হয়েছে। কোনো সুবিধাই খেলাপি ঋণ কমাতে পারেনি। ব্যাংকগুলোর হাতে ঋণ পুনঃতফসিল করার ক্ষমতা দেওয়ার ফলে দুর্বল ব্যাংকগুলোতে এখন বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন কিছু একটা করতে না পারলে খেলাপি সমস্যা আরও প্রকট হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনটি বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৯৮ হাজার ৫৯২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি ১১ লাখ টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। তিন মাস আগে গত জুনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বা ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ফলে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯ হাজার ৩৩৮ কোটি ১১ লাখ টাকা। আর ২০২১ সালে ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বা ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ফলে নয় মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ১২২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির গতি বেশি : প্রতিবেদনে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের বড় অংশই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকগুলোতে। গত সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০ হাজার ৫০১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ২৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। তিন মাস আগে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৫ হাজার ৪২৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বা ২১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এ সময় বেসরসকারি ৪২ ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। তিস মাস আগে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ৬২ হাজার ৬৭৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বা ৬ দশমিক ০১ শতাংশ। একই সময়ে বিশেষায়িত তিন ব্যাংকে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২২৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। তিন মাস আগে তাদের খেলাপি ঋণ ছিল ৪ হাজার ১৯৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা বা ১১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বিদেশি নয় ব্যাংকে খেলাপিঋণ ২ হাজার ৯৭০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা বা ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। তিন মাস আগে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৫৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা বা ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ।

৮৮ শতাংশই মন্দ ঋণ : ব্যাংক খাতে আদায় অযোগ্য মন্দমানের খেলাপি ঋণ বাড়ছে আশঙ্কাজনকহারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বর শেষে এ খাতে মন্দমানের খেলাপিঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, যা এ খাতে মোট খেলাপি ঋণের ৮৮ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বরেও এ খাতে মন্দ ঋণ ছিল ৯১ হাজার ৫৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ফলে গত নয় মাসের ব্যবধানে মন্দ ঋণই বেড়েছে ২৭ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। হাতেগোনা আট থেকে ১০টি ব্যাংকে মন্দ ঋণের আধিক্য বেশি। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব ঋণের বেশির ভাগই বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম, জাল-জালিয়াতি ও যোগসাজশের মাধ্যমে বের করে নেওয়া হয়েছে। এ মানের ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুব কম থাকে।

 

এ জাতীয় আরও খবর

বিদায়ি বক্তব্যে কাঁদলেন মির্জা ফখরুল

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১৪ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার

১২ জেলায় ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা

ময়মনসিংহে এনসিসি ব্যাংকের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন ও বৃক্ষবিতরণ অনুষ্ঠিত

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশকে ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের সভা

জিয়া-খালেদার সমাধিতে বিএনপির নতুন ৪ নেতার শ্রদ্ধা

সমাজের সবাই এগিয়ে এলে বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় পতন

রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করতে চাই: মির্জা ফখরুল

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে যা করবেন, যা করবেন না