,

নিম্নবিত্তের নাগালের বাইরে পাঙাশ-তেলাপিয়া, আমিষের জোগান নিয়ে শঙ্কা

news-image

‘রুই-কাতলা না হয় বাদই দিলাম, পাঙাশ-তেলাপিয়া কিনে যে পেট ভরাব— সে উপায়ও আর রইল না’। রাজধানীর বাজারে দাঁড়িয়ে এভাবেই নিজের ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব প্রকাশ করছিলেন এক পোশাক শ্রমিক। বাজারচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, কেবল ঢাকা নয়, লালমনিরহাট থেকে শুরু করে দেশের জেলা পর্যায় পর্যন্ত নিত্যপণ্যের দামের চাপ এখন সবসীমা ছাড়িয়ে গেছে। এক কেজি মাছের জায়গায় আধা কেজি কিংবা গোটা তেলাপিয়ার বদলে কাটা পাঙাশের চাকা কিনে বাড়ি ফেরা এই মানুষগুলোর গল্পই এখন বাংলাদেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নিত্যদিনের বাস্তব রূপ।

একসময় যে মাছ কিনলে বাজারের ব্যাগ ভারী হতো, সেই পাঙাশ ও তেলাপিয়ার দামও এখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের হিসাব মেলাতে দিচ্ছে না। অন্যান্য মাছ আগেই নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল। প্রোটিনের শেষ ভরসা হিসেবে পরিচিত এই দুই চাষের মাছও এখন বাজারে কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে পরিবারের পাতে মাছের পরিমাণ কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আকারভেদে পাঙাশের দাম কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ২২০ টাকা। তেলাপিয়ার দাম আরও চড়া। মাঝারি আকারের তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়, আর এক কেজির বেশি ওজনের বড় তেলাপিয়ার দাম ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা। অর্থাৎ মাঝারি তেলাপিয়ার দামও এখন বড় পাঙাশের প্রায় সমান, যা সাধারণ ক্রেতার জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

রাজধানীর রামপুরা এলাকার বাসিন্দা এরশাদ আলী পেশায় কাঠমিস্ত্রি। চার সদস্যের সংসারে মাছ কেনার হিসাব এখন তাকে নতুন করে কষতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘রুই, কাতলা, বোয়াল, শিংসহ অন্য মাছ তো আমরা কিনতেই পারি না। কিনতাম শুধু পাঙাশ আর তেলাপিয়া। এখন এগুলোর দামও বেশি, তাই মাছ কেনা কমিয়ে দিয়েছি।’

তবে, মাছের পরিমাণ একেবারে বাদ দেননি তিনি। এরশাদ আলী জানান, বাজারে মাঝেমধ্যে কাটা পাঙাশ পাওয়া যায়, যেখান থেকে আধা কেজিও কেনা যায়। মাঝেমধ্যে সেটাই কেনেন তিনি। তেলাপিয়ার ক্ষেত্রে দামের জন্য অপেক্ষা করতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ছোট তেলাপিয়ার দাম যখন কম থাকে, তখন কিনি। কিন্তু এখন দাম বেশি, তাই তেলাপিয়াও কেনা যায় না।’

মালিবাগ বাজারে কথা হয় পোশাক শ্রমিক দুলু মিয়ার সঙ্গে। সীমিত আয়ের এই ক্রেতার কাছে পাঙাশ ও তেলাপিয়া ছিল মাছ কেনার শেষ আশ্রয়। দাম বাড়ায় সেই আশ্রয়ও এখন তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

দুলু মিয়া বলেন, ‘কিছুদিন আগেও পাঙাশ-তেলাপিয়ার দাম কিছুটা কম ছিল। এখন আবার বেড়েছে। তাই এই মাছগুলোও আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কেনা কঠিন হয়ে গেছে।’

তবে, দাম বাড়লেও মাছ কেনা পুরোপুরি বন্ধ করার সুযোগ নেই তার। পরিবারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পরিবারে ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রী আছে, তাই মাছ না কিনলে চলে না। সে জন্য সপ্তাহে এক-দুই দিন বেশি দামেই পাঙাশ-তেলাপিয়া কিনি। তবে, আগের চেয়ে কেনার পরিমাণ কমে গেছে।’

অন্য মাছের দাম সাধ্যের বাইরে থাকায় খরচ সামলাতে মাঝেমধ্যে কাটা মাছের ওপরও ভরসা করতে হয় বলে জানান তিনি।

বাজারে এখন প্রতি কেজি তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৫০ টাকায়। ২০২২ সালে এই মাছের দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৪০ টাকা থেকে শুরু। সে হিসাবে কেজিতে দাম বেড়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৫৭ শতাংশ।

নিম্নবিত্তের আরেক পছন্দের মাছ পাঙাশের অবস্থাও একই। এক থেকে দেড় কেজি ওজনের পাঙাশ এখন কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ২২০ টাকায় মিলছে। দুই থেকে তিন কেজির পাঙাশের দাম ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, আর এর চেয়ে বড় আকারের মাছের দাম আরও বেশি। অথচ কয়েক বছর আগে ছোট ও মাঝারি আকারের পাঙাশ কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় কেনা যেত।

দেশের মিঠাপানির মাছের একটি বড় অংশের জোগান আসে চাষ থেকে। ময়মনসিংহ, যশোর, বগুড়া, রাজশাহী, কুমিল্লা ও আশপাশের জেলাগুলো এ খাতে সবচেয়ে এগিয়ে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পুকুরে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় আটটি প্রজাতির মাছ— পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, সিলভার কার্প, মৃগেল, কমন কার্প ও কই। এর মধ্যে উৎপাদনে শীর্ষে আছে পাঙাশ ও তেলাপিয়া। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে পাঙাশ উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ৫ হাজার টন, আর তেলাপিয়া ৩ লাখ ৫৪ হাজার টন। দুই মাছ মিলিয়ে মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার টনে। তবে, উৎপাদন খরচ বাড়ায় বাজারে এসব মাছের দাম বেড়েছে।

এদিকে, বাজারে ক্রেতারা যেমন দাম নিয়ে চাপে আছেন, বিক্রেতারাও তার প্রভাব টের পাচ্ছেন বিক্রিতে। বাড্ডা বাজারের মাছ বিক্রেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মাছের দাম কিছুটা বাড়ায় আমাদের বিক্রি কমে গেছে।’

বিক্রি কমার ধরন ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আগে যে ক্রেতা এক, দেড় বা দুই কেজি পাঙাশ ও তেলাপিয়া কিনতেন, তিনিই এখন কিনছেন আগের অর্ধেক। দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতারা কম কিনছেন, আর তাতে আমাদের মতো ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের বিক্রি কমে গেছে।’

বাজারে ক্রেতার ভিড় থাকলেও আগের মতো বিক্রির পরিমাণ নেই বলে জানান বিক্রেতারা।

দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের মাছ বিক্রেতা আবুল কালাম চাষ থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের খরচ বাড়ার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘প্রথম কারণ মাছের খাবারের দাম বৃদ্ধি, যার ফলে উৎপাদন খরচও বেড়েছে। খরচ বাড়ায় চাষিরা আগের চেয়ে বেশি দামে পাইকারি বাজারে মাছ বিক্রি করছেন, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।’

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কথা জানিয়ে বলেন, ‘মাছ আনা-নেওয়ার একটি গাড়ির ভাড়া আগে ছিল ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে ২০ হাজার টাকা বা তারও বেশি হয়েছে। এর বাইরে লাইনম্যান ও বিভিন্ন খাতে নানা ধরনের বাড়তি খরচ যুক্ত হয়। সবমিলিয়ে মাছচাষি থেকে শুরু করে পাইকারি বাজার হয়ে পাড়া-মহল্লার খুচরা বাজারে মাছ পৌঁছাতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্টদের মতে, আমিষের সস্তা উৎস পাঙাশের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের মাছ খাওয়া কমে যাবে, যা পুষ্টি নিরাপত্তার ঘাটতি তৈরি করতে পারে। মাছের খাবারের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে বলে উল্লেখ করে তারা খাবারের দাম কমানোর জন্য গবেষণায় জোর দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

দেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত এই মাছ দুটির দামও এখন সীমিত আয়ের মানুষের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। খাবার ও পরিবহনসহ নানা খরচের চাপে চাষির পুকুর থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি টাকা। এর ফল ভোগ করছেন ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই। দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না এলে প্রোটিনের এই সহজলভ্য উৎসও ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের পাত থেকে হারিয়ে যেতে পারে— এমন আশঙ্কা এখন বাজারজুড়ে।

এ জাতীয় আরও খবর

স্পেন-যুক্তরাজ্য সফরে যাচ্ছেন শামা ওবায়েদ

‘অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু নিয়ে দূষণে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচে ঢাকা

প্রথমবার পালমারের লাল কার্ড, চেলসির ১০০!

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভে গ্রেপ্তার প্রায় ১ হাজার

ছুটির পর চেনা রূপে ঢাকা, সড়কে যানজট-গণপরিবহনে ভিড়

ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের জন্মদিন আজ

মাদ্রাসা শিক্ষককে থাপ্পড় দেওয়া রুমিকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশের অভিযান

এভারটনকে হারিয়ে ম্যানসিটিকে ধরে ফেলল আর্সেনাল

নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টিতে অনন্য মাইলফলক ভারতের

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন

সংবিধান সংশোধনে নোট অব ডিসেন্ট পরিবর্তনের প্রস্তাব দিতে বললেন সালাহউদ্দিন আহমদ

তারেক রহমানের সফরে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের প্রত্যাশা