মোহাম্মদপুর গৃহায়ণ প্রকল্পে অনিয়ম, ফ্ল্যাট বরাদ্দের তথ্য উন্মোচন
নিজস্ব প্রতিবেদক : গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) আওতাধীন মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটের বহুতল ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পে উচ্ছেদকৃত মূল বাসিন্দাদের আবাসন অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। বিগত সরকারের আমলা ও প্রভাবশালী মহলের অনুকূলে নিয়মবহির্ভূত কোটা এবং বিতর্কিত লটারির মাধ্যমে এসব ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আজ সোমবার দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে ‘মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেট ‘ডি’ টাইপ কলোনী কল্যাণ সমিতি। এছাড়া একই দিন জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন সংগঠনটি।
পুনর্বাসনের নামে উচ্ছেদ ও বৈষম্য:
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরের আসাদ অ্যাভিনিউয়ের ‘গৃহায়ণ কনকচাঁপা’ এবং সাত মসজিদ রোডের ‘গৃহায়ণ দোলনচাঁপা’ প্রকল্পে মোট ৪৩০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণাধীন রয়েছে। ১৯৬০ সাল থেকে এই কলোনির ছোট ফ্ল্যাটগুলোতে বসবাসকারী ক্ষতিগ্রস্ত ২৮৮টি নিম্ন-আয়ের পরিবারের পুনর্বাসনের লক্ষ্যেই ডিপিপিতে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছিল।
তবে ২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর বিজ্ঞ আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থাতেই এক উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে এই পরিবারগুলোকে বাস্তুচ্যুত করা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ শর্ত মেনে ও প্রায় ৮ লাখ টাকা সরকারি রাজস্ব বকেয়া পরিশোধ করার পরও মাত্র ১১৮টি আবেদনকে বৈধ বলে প্রাথমিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাকিদের প্রক্রিয়াটি এখনও অনিশ্চিত। পাশাপাশি, অন্য প্রকল্পের তুলনায় এই ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন-আয়ের মানুষদের জন্য মূল্য পরিশোধের কিস্তি সুবিধা ৮ বছর থেকে কমিয়ে মাত্র ৪ বছর করে বৈষম্যমূলক শর্ত চাপানো হয়েছে।
কোটি টাকার মালামাল লোপাট ও নকশা পরিবর্তন:
উচ্ছেদের পর কলোনির পুরাতন ৮টি ভবন ভাঙার সময় ১৬ লক্ষাধিক উন্নতমানের ইটসহ বিপুল পরিমাণ লোহা, দরজা এবং স্যানিটারি সামগ্রী উদ্ধার করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালকের নেতৃত্বে এই বিপুল পরিমাণ মালামাল সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজস্ব ঠিকাদারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এছাড়া ‘গৃহায়ণ দোলনচাঁপা’ প্রকল্পের অনুমোদিত মূল নকশা (Approved Drawing) সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে প্রতিটি ফ্ল্যাটের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিন্যাসে অননুমোদিত পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন বহির্ভূত নির্মাণসামগ্রী ও উপকরণ ব্যবহারের ফলে ভবনের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ক্ষতিগ্রস্তদের বঞ্চিত করে প্রভাবশালীদের সন্তুষ্ট করতে সংরক্ষিত কোটায় ৫২টি, গ্রেডেশনে ৫৬টি এবং বিতর্কিত লটারির মাধ্যমে ৫৬টিসহ মোট ১৬৫টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এমনকি জাগৃকের তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজের নামে একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন। এছাড়া সংস্থার ৪ কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্দিষ্ট ভবনের একাধিক ফ্ল্যাট এবং ফ্লোর গ্যারেজ কোনো প্রকার লটারি ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নিজেদের দখলে নিয়েছেন।
বৈষম্যহীন বাংলাদেশে পুনর্বাসনের দাবি:
ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানান, তারা দীর্ঘ চার বছর ধরে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, জাগৃক ও দুদকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন এবং মানববন্ধন করেছেন। বিগত সরকারের আমলে তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশি বাধা ও লাঠিচার্জের ঘটনাও ঘটেছিল।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে ভুক্তভোগীরা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে দেশের অন্যান্য বড় প্রকল্পে অবৈধ প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ যেভাবে বাতিল করা হচ্ছে, ঠিক একইভাবে এই প্রকল্পেরও সমস্ত সংরক্ষিত কোটা ও বিতর্কিত লটারির অবৈধ বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অবিলম্বে তাদের ন্যায্য আবাসন বুঝিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন কলোনিবাসী।











