,

গান্ধী পরিবার রাজনীতিতে যেভাবে পিছিয়ে পড়ল

news-image

অনলাইন ডেস্ক : নিরুপায় হয়ে অবশেষে গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে দেশজুড়ে পদযাত্রা শুরু করেছেন রাহুল গান্ধী। তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারি থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত ৩৫০০ কিলোমিটার পথ ১৫০ দিনে পাড়ি দেবেন তিনি। তার এই অভিনব পদযাত্রার লক্ষ্য হলো নিজ দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতি ভোটারদের মধ্যে ফের আগ্রহ জাগিয়ে তোলা। ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলটিকে এখন ভোটের জন্য রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

রাহুল গান্ধীর প্রতিটি পদক্ষেপ লাইভ ফিডে এবং সোশাল মিডিয়ায় প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু তিনি আর দলটির নেতা নন। আগামী নির্বাচনে কংগ্রেসের নেতৃত্ব দেবেন দলটির নতুন সভাপতি মল্লিকার্জুন খাগড়ে। ২০ বছর পর ফের দলটির নেতৃত্ব গান্ধী পরিবারের হাতছাড়া হলো। স্বাধীন ভারতের ৭৫ বছরের মধ্যে ৪০ বছরই দেশটির ক্ষমতা ছিল গান্ধী পরিবারের হাতে। আর বাকী ৩৫ বছরেরও বেশিরভাগ সময়ই কংগ্রেসের নেতৃত্ব গান্ধী পরিবারেই ছিল।

কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভারত এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। যার ফলে দেশটির রাজনীতিতে গান্ধী পরিবার এবং কংগ্রেস তার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও গুরুত্ব হারিয়েছে। এর পেছনে দলটির ভেতরের অব্যবস্থাপনা এবং অসংখ্য দুর্নীতির কেলেঙ্কারিও দায়ী।

নয়াদিল্লি-ভিত্তিক রাজনৈতিক ভাষ্যকার আরতি আর জেরাথ বলেন, ‘গান্ধীরা আজ সম্পূর্ণরূপে বামন হয়ে গেছেন এবং নরেন্দ্র মোদীর ছায়ায় ঢাকা পড়েছেন। ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন, কিন্তু আমরা দেশের নেতৃত্বে ফের গান্ধী পরিবারের কাউকে দেখতে পাব এমন সম্ভাবনা খুবই কম। অথচ এই পরিবার স্বাধীন ভারতের বেশিরভাগ সময়ই দেশটির ক্ষমতায় ছিল।’

নেহরু-গান্ধীর উত্তরাধিকার

গান্ধী পরিবারকে অনেক সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী কেনেডি পরিবারের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কয়েক দশক ধরে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি একাধিক ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ট্র্যাজেডি মোকাবিলা করে ভারতকে শাসন করেছেন তারা। তবে তারা ভারতের স্বাধীনতার নায়ক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নয়, জওহরলাল নেহরুর বংশধর। নেহরুও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। নেহরুর মেয়ে ইন্দিরার স্বামী ফিরোজ গান্ধীও কংগ্রেস নেতা ছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই ফিরোজ তার নামের সঙ্গে গান্ধী যোগ করেছিলেন। নেহরুর পর তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসের দায়িত্ব পান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন।

স্বাধীনতার পর নেহরু ১৭ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। নেহরু দরিদ্র একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতার পরের কয়েক দশকের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের বীজ রোপণ করেছিলেন। জেরাথ বলেন, ‘তিনি নিজে স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ ছিলেন, তাই তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন ভারত যেন তার পূর্ণ সম্ভাবনা অনুযায়ী উন্নতি করতে পারে।’

নেহরু গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রচার ও প্রসার করেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেন, ভারতের শীর্ষস্থানীয় আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলেন এবং গভীরভাবে পিতৃতান্ত্রিক একটি দেশে লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ১৯৬৪ সালের ২৮ মে মারা যান নেহরু।

তার মৃত্যুর পর এক বছর সাত মাস ভারতের দায়িত্ব ছিল লালা বাহাদুর শাস্ত্রীর হাতে। এরপর নেহরুর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। ছোটবেলা থেকেই এই পদের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন ইন্দিরা। তাকে একজন বুদ্ধিমান, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন এবং স্বৈরাচারী নেতা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। প্রথমে তিনি ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত টানা ১১ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এরপর তিন বছর ক্ষমতার বাইরে ছিলেন এবং ১৯৮০ সালে পুনরায় নির্বাচিত হন। তার সময়কালে ভারতে খরা, দুর্ভিক্ষ এবং অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছিল। এছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধও হয়েছিল।

১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি করে বিরোধীদের জেলে পোরা সহ ২১ মাসের জন্য মৌলিক নাগরিক অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবরে এক শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে মারা যান ইন্দিরা। তার চার মাস আগে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে পাঞ্জাবের অমৃতসরে শিখদের স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযানের আদেশ দিয়েছিলেন।

ইন্দিরার মৃত্যুর পর তার ছেলে রাজীব গান্ধীকে তার অনিচ্ছা স্বত্বেও ভারত শাসনের দায়িত্ব নিতে হয়। ৪০ বছর বয়সে রাজীব গান্ধী ভারতের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হন। তবে মাত্র পাঁচ বছর পর ১৯৮৯ সালে এক দুর্নীতির কেলেঙ্কারির জেরে জাতীয় নির্বাচনে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হন রাজীব। আর এর দুই বছর পর শ্রীলঙ্কার তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে গুপ্তহত্যার শিকার হন।

তার আমলে তিনি যেসব রাজ্যে ধর্মীয় উত্তেজনা বেশি ছিল সেসব রাজ্যের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে শান্তি চুক্তি করেন। ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের জন্যও তাকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তাকে বলা হয় ভারতের ‘তথ্য ও প্রযুক্তির জনক’।

১৯৯০-র দশকে বিজেপির উত্থানে কংগ্রেস ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ে। এর পরের বছরগুলোতে ভারতের নেতৃত্ব কংগ্রেস এবং অন্য দলগুলোর মধ্যে পালাবদল হয়। এর মধ্যে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত নরসিংহ রাও এর নেতৃত্বে কংগ্রেস পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিল। তবে, ১৯৯৮ সালে রাজীব গান্ধীর বিধবা স্ত্রী সোনিয়া কংগ্রেসের হাল ধরার আগ পর্যন্ত কংগ্রেসের নেতৃত্ব গান্ধী পরিবারের বাইরেই ছিল।

এর ছয় বছর পর তার নেতৃত্বে কংগ্রেস ফের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে। কিন্তু সোনিয়া নিজে শীর্ষ পদে না বসে অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী করেন। মনমোহনের নেতৃত্বে ফের টানা দুই মেয়াদে (২০০৪-২০১৪) কংগ্রেস ভারতের ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির নতুন জোয়ারের ফলে কংগ্রেস আবারও ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন।

রাজনৈতিক ভাষ্যকার জেরাথ বলেন, ‘গান্ধীদের পরিণতিও যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি পরিবারের মতোই হয়েছে। ভারতের আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করেছিলেন গান্ধীরাই। তাদের উত্তরাধিকার আজও অনুভূত হয়। অথচ তারাই এখন ক্ষমতা থেকে চিরতরে ছিটকে পড়তে চলেছেন।’

 

হিন্দুত্ববাদের জনিপ্রয়তায় জোয়ার

২০১৯ সালের নির্বাচনে অপমানজনক এবং বিপর্যয়কর পরাজয়ের পরে রাহুল গান্ধী প্রকাশ্যে কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন। মোদির বিজেপি ঐতিহাসিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয় এবং ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধীদের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভুত হয়।

লেখক কিদওয়াই বলেন, ‘মোদি বয়ান হাজির করলেন যে, গান্ধীরা মূলত উদারপন্থী অভিজাত রাজবংশ, যাদের আর ক্ষমতায় থাকা উচিৎ নয়। তার এই নতুন রাজনৈতিক বয়ান ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়।’ এছাড়া ভারতের ৩০ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৮০% হিন্দু। ফলে মোদির হিন্দু জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিও দেশটির জনগণের বড় অংশের কাছেই বেশ আবেদন তৈরি করে।

জেরাথ বলেন, ‘ভারত বদলে যাচ্ছে। কংগ্রেসের আমলে গণতন্ত্রের বিকাশের পাশাপাশি আমরা এমন একটি নতুন শ্রেণীর উত্থান দেখেছি যারা নেহরুর গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নন। তারা মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি পছন্দ করছেন। কিন্তু গান্ধী পরিবারের নতুন প্রজন্ম তাদের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

তদুপরি, কংগ্রেসের ভেতরে কয়েক দশক ধরে চলমান অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং অব্যবস্থাপনাও ভারতের রাজনীতিতে দলটির অবস্থানকে দুর্বল করেছে। রাহুল এবং সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। কংগ্রেসের সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের দ্বিতীয় মেয়াদে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে উঠে।

জেরাথ বলেন, ‘গান্ধীদের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত এবং পশ্চিমা-প্রভাবিত জীবন যাত্রার বিপরীতে মোদীর একজন চা বিক্রেতার ছেলে হওয়ার বিষয়টিও তাকে নতুন উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির জনগণের কাছে জনপ্রিয় করেছে। কারণ তারা মোদীর মাঝে নিজেদের ছায়া দেখতে পান।’ এজন্যই হয়তো কংগ্রেসও এবার দলের সভাপতি হিসেবে বেছে নিয়েছে দরিদ্র দলিত সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা মল্লিকার্জুন খাগড়েকে। নেহরু, রাজীব এবং রাহুল ব্রিটেনের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে পড়েছেন। ইন্দিরা পড়েছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। অন্যদিকে, মোদির পাঠশালা ছিল মূলত হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস।

কিদওয়াই বলেন, ‘রাহুল গান্ধী সাফল্যের সন্ধান করছিলেন কিন্তু তা তার অধরাই রয়ে গেল। সে কারণেই তিনি ভিন্ন ভূমিকা নিয়েছেন এবং সারা দেশে এই পদযাত্রা শুরু করেছেন।’ রাহুল গান্ধীর এই অভিনব উদ্যোগের ফলে কংগ্রেসের ভাবমূর্তি হয়তো পুনরুদ্ধারও হতে পারে। তবে তিনি তার বাবা, দাদী এবং নানার মতো কখনোই দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন বলে মনে হয় না। তিনি চিরকুমার এবং তার কোনও সন্তান নেই। তার বোন প্রিয়াঙ্কার দুটি সন্তান রয়েছে। তবে তারা রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সকলের চোখ থাকবে এবার নতুন সভাপতি মল্লিকার্জুন খাগড়ের দিকে। তিনি ২০২৪ সালে মোদির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত ভোট টানার চেষ্টা করবেন। জেরাথ বলেন, ‘ক্ষমতার ওপর এখনো মোদীর নিশ্চিত দখল রয়েছে, তা ঠিক। তবে কংগ্রেস যদি দলের মধ্যে সঠিক সমন্বয় করে নিজেদের কাজগুলো একসঙ্গে করতে পারে, তাহলে আমরা হয়তো ফের দলটিকে ভারতের ক্ষমতায় দেখতে পাব।’

 

এ জাতীয় আরও খবর

বিদায়ি বক্তব্যে কাঁদলেন মির্জা ফখরুল

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১৪ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার

১২ জেলায় ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা

ময়মনসিংহে এনসিসি ব্যাংকের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন ও বৃক্ষবিতরণ অনুষ্ঠিত

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশকে ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের সভা

জিয়া-খালেদার সমাধিতে বিএনপির নতুন ৪ নেতার শ্রদ্ধা

সমাজের সবাই এগিয়ে এলে বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় পতন

রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করতে চাই: মির্জা ফখরুল

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে যা করবেন, যা করবেন না