শুক্রবার, ২৪শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৯ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ন্যূনতম অবকাঠামো ও শিক্ষক নেই একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে

news-image

শরীফুল আলম সুমন : ২০০২ সালে অনুমোদন পায় স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পেরিয়ে গেছে, আজও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি। একসময় সিদ্ধেশ্বরীতে লিজ নেওয়া বাড়িতে এবং ধানমন্ডিতে ‘ক্যাম্পাস’ ছিল তাদের। এখন শুধু সিদ্ধেশ্বরী ‘ক্যাম্পাস’ আছে। ওই বাড়ির লিজ ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাদের বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য আল্টিমেটাম দিয়েছে, নয়তো নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখতে বলেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক এম এ হান্নান ফিরোজ। তার মৃত্যুর পর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে জটিলতা দেখা দেয়। ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব বাধে। হান্নান ফিরোজের স্ত্রী ফাতিনাজ ফিরোজ ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান। ডেমরার গ্রিন মডেল টাউনে বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থায়ী ক্যাম্পাস হচ্ছে। ২০২৫ সালের আগে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয় বলে ইউজিসিকে জানিয়েছে তারা। প্রচুর দায়-দেনা থাকায় স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজও ভালোভাবে এগোচ্ছে না। চরম দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে একসময়ের নামকরা এ বিশ্ববিদ্যালয়।

শুধু স্ট্যামফোর্ড নয়, ১০৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৮টিই চরম দুরবস্থায়। ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশের চিন্তা করছে ইউজিসি। ৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা টাকার বিনিময়ে বদল করতে চান উদ্যোক্তারা। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নামকাওয়াস্তে চলে; এগুলোর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শিক্ষক ও ল্যাবরেটরি নেই। শিক্ষার্থীই পাচ্ছে না তারা। শিক্ষকদেরও ঠিকমতো বেতন দিতে পারছে না। বোর্ড অব ট্রাস্টিজে দ্বন্দ্ব আছে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে রয়েছে সনদ বিক্রির অভিযোগ।

ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের সদস্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা বদল নিয়ে আইনে কিছু বলা নেই। অর্থ লেনদেনের সুযোগও নেই। কেউ অর্থ লেনদেন করে থাকলে তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়। তা করলে আমরা কিছু বলতে পারি না। সংশোধিত আইনে আমরা এ বিষয়টিকে অ্যাড্রেস করব। সংশোধনীতে ট্রাস্টি বোর্ডের বড় পরিবর্তনে আচার্যের অনুমতি নেওয়ার বিধান যুক্ত করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সনদবাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে, প্রমাণসাপেক্ষে তাদের ব্যাপারে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করার সুপারিশও করতে হয়, তাহলে তাও আমরা করব। আইন সংশোধিত হলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই নিয়মের মধ্যে চলে আসতে বাধ্য হবে।’

রাজধানীর মিরপুরের সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (সিইউএসটি) ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে দ্বন্দ্ব অনেক দিনের। এটির প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খানের মৃত্যুর পর ২০১৬ সালে গাজী মাহবুবুল আলমকে চেয়ারম্যান ও গাজী এম এ সালামকে সদস্য সচিব করে নয় সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। গাজী এম এ সালাম আবার তার স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেছিলেন। গাজী সালামের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী ইলোরা পারভীন ওই বোর্ডের চেয়ারম্যান হন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়টির হাতবদলের জন্য প্রথমে ১২ কোটি টাকায় এক পক্ষের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করেন। পরে ১৩ কোটি টাকায় আরেক পক্ষের কাছে বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রথম পক্ষের দেওয়া অগ্রিমের ৩০ লাখ টাকা এখনো ফেরত দেয়নি ইলোরা পারভীন-নিয়ন্ত্রিত ট্রাস্টি বোর্ড।

গত ২৭ জুলাই রাজধানীর ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা)-এর সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এক বছর ধরে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ না থাকায় ২৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে যেতে অপারগতা জানান শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ফলে সমাবর্তনটি স্থগিত হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় ২০০১ সালে স্থাপিত হলেও এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাসের কাজ শুরু করতে পারেনি। দিন দিন শিক্ষার্থী কমছে। মানসম্পন্ন শিক্ষক নেই। শিক্ষকদের বেতন ১০-১৫ হাজার টাকা। এ বিশ্ববিদ্যালয়েরও হাতবদল নিয়ে আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

রাজধানীর উত্তরায় ২০২০ সালে অনুমোদন পায় মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। এর উদ্যোক্তা অধ্যাপক আর আই শরীফ। অনুমোদনের দুই বছর পার হলেও কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ তেমন দেখা যাচ্ছে না। উদ্যোক্তার পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা সম্ভব নয় বলে জানা গেছে। কথা উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির হাতবদল করতে চান উদ্যোক্তা। ১৫ কোটি টাকা হলেই হবে, তবে ট্রাস্টি বোর্ডে বর্তমান উদ্যোক্তাকে রাখতে হবে।

সূত্র জানায়, কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সনদবাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এর প্রমাণও পাওয়া গেছে। টাকার বিনিময়ে সনদ বিক্রির অন্যতম হোতা আমেরিকা-বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি। তারা ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রিও বিক্রি করেছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে ইবাইস ইউনিভার্সিটি ও দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার। তাদের বিরুদ্ধেও সনদ বিক্রির অভিযোগ আছে। এগুলোতে শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ নেই। এ তিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সুপারিশ করবে ইউজিসি।

সনদবাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকাসহ আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থী না থাকলেও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ অনেকের কাছেই রয়েছে। বিশেষ করে যারা বিদেশে যান তাদের অনেকেরই রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকার সনদ রয়েছে।

ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে চরম দ্বন্দ্বে রয়েছে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। বিদেশে টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়ার বিরুদ্ধে।

শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো (ক্লাসরুম ও ল্যাবরেটরি), এমনকি শিক্ষকও নেই জার্মান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, টাইমস ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ফেনী ইউনিভার্সিটিতে। বেশির ভাগের পরিবেশ কোচিং সেন্টারের মতো। আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সংকটে জর্জরিত। তারা এগোতে পারছে না কোনোভাবে। প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নেই।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, আগে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই সনদ বিক্রি হতো। ভর্তি না হয়েও সনদ কেনা যেত। এখন সনদ বিক্রির ধরন বদলেছে। এখন ইউজিসিকে ভর্তি দেখাতে হয়, এজন্য সরাসরি সনদ বিক্রির সুযোগ কম। কোনো শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট সময়ে ভর্তি হয়ে থাকলে, পড়ালেখা করুক বা না করুক তাকে সনদের নিশ্চয়তা দেয় কিছু বিশ্ববিদ্যালয়। কৌশলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চার বছরের কোর্সের সনদ তিন বা আড়াই বছরেও দিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে আগের তারিখে তাদের ভর্তি দেখানো হয়।

ক্রেডিট ট্রান্সফার করে শিক্ষার্থী এনে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অল্প সময়ে শিক্ষার্থীদের সনদ দিয়ে দেয়। চাকরিজীবীদের জন্য ইএমবিএ (এক্সিকিউটিভ এমবিএ) কোর্স ১ বছরের। আর নিয়মিত এমবিএ কোর্স ২ বছরের। এসব কোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করুক আর না করুক, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসুক বা না আসুক তাদের সর্বোচ্চ জিপিএ দিয়ে সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, যত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে তবে সে তুলনায় ইউজিসির লোকবল তত নয়। ফলে তারা তদারকিতে হিমশিম খাচ্ছে। আবার অনিয়ম করা প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত। ফলে অনেক সময় অনিয়মের প্রমাণ পেয়েও ইউজিসি তা এড়িয়ে যায় বা ব্যবস্থা নিতে পারে না।

 

এ জাতীয় আরও খবর

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ হলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মালদ্বীপের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের বৈঠক

বোয়ালখালীতে ৫ শ্রমিকের মৃত্যু, মামলা ছাড়াই চলছে সমঝোতার চেষ্টা

১৭ বছর পর ইংল্যান্ড সফরে বাংলাদেশ, টেস্ট হবে লর্ডসে

২৭ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম বোর্ডের HSCপরীক্ষা শুরু

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তারেক রহমানকে মোদির আমন্ত্রণ

গাজী নজরুলের বহিষ্কার জানিয়ে ইসিকে চিঠি জামায়াতের

ইরান ইস্যুতে কঠিন কূটনৈতিক চাপে ট্রাম্প

মানবিক সহায়তায় আলোচনায় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’

২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য বাংলাদেশের

শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ড. খলিলুরের বৈঠক

তথ্যমন্ত্রীর নামে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, সতর্কবার্তা