,

দৃশ্যমান দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস নেই দুদকের

news-image

কবির হোসেন
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমালোচনা করে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘আমরা সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছি যে হাজার হাজার দৃশ্যমান দুর্নীতিবাজ সম্পদ ও অর্থ দখলে রাখা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত তাদের ব্যাপারে দুদক কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা ও সাহস দেখাতে পারছে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে জ্ঞাত আয় বহিভর্‚ত সম্পদ অর্জনের বিষয়ে দুদক আইনের ২৬ ও ২৭ ধারায় ব্যবস্থা নিতে কমিশনের এখনো নিজস্ব কোনো উদ্যোগ নেই। এক্ষেত্রে কমিশন শুধু মিডিয়া রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে আছে।’

‘হাজী মো. সেলিম বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ আপিল মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই মন্তব্য করেছেন।

আদালত বলেছেন, ‘প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক ও অসাংবিধানিক পদধারীসহ সব কর্মচারীর ভেতরের দুর্নীতি চিহ্নিত করে তা নির্মূলের জন্য কমিশনের অবশ্যই কার্যকরী এবং সক্রিয় ভূমিকা আমরা প্রত্যাশা করি। আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশক্রমে আমরা দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করার জন্য দায়বদ্ধ।’

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘এই আপিলের আইনি এবং বাস্তবিক দিকগুলোর পাশাপাশি আমাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, দুর্নীতি একটি মানসিক ব্যাধি, যা শুধু শারীরিক শাস্তি দিয়ে নির্মূল হতে পারে না। কিন্তু কমিশন এবং বিচার বিভাগসহ সবক্ষেত্রে দুর্নীতির ক্ষেত্র চিহ্নিত করে এবং ব্যক্তি অথবা ব্যক্তি-গোষ্ঠী যারা দুর্নীতিতে আসক্ত, সুবিধাভোগী এবং দুর্নীতির জন্য সুবিধাপ্রাপ্ত, তাদের নাম তালিকাভুক্ত করতে হবে। চিহ্নিত করে তাদের যত দ্রুত সম্ভব কমিশন থেকে বা কোনো ব্যক্তিগত বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং আদালতের পক্ষ থেকে সতর্ক করে চিঠি দিতে হবে। আমরা জানি, এটা হবে একটি কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কারণ, একজন সৎ লোকও দুর্নীতিগ্রস্তদের তালিকায় পড়ে যেতে পারেন। তারপরও আমাদের একটি দুর্নীতিমুক্ত এবং সভ্য সমাজ গড়ে তুলতে হলে কোথাও না কোথাও থেকে শুরু করতে হবে।’

রায়ে বলা হয়েছে, দুর্নীতির কারণে বিশ্বে আমাদের যে অবস্থান, সেটা নিয়ে লজ্জিত। এ জন্য দায়ী হচ্ছেন বিভিন্ন সেক্টরে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজ। এই দুর্নীতিবাজ চক্র অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ও সংঘটিত। এসব দুর্নীতিবাজদের সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা উচিত।

এদিকে পূর্ণাঙ্গ রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৭ এ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে বিশেষ আদালতকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। তবে হাজী সেলিমের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমেদ রাজা বলেছেন, ‘আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই আমরা বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করব। আত্মসমর্পণের পর আপিল বিভাগের হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করা হবে।’

গত ৯ মার্চ দুদকের অবৈধ সম্পদের মামলায় হাজী সেলিমের সাজা বহাল রেখে রায় দেন হাইকোর্ট। বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিশেষ জজ আদালত জ্ঞাত আয় বর্হিভূত সম্পদ অর্জনের এই মামলায় তাকে ১৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাজী সেলিমের আপিল পুনঃশুনানি করে ১০ বছরের সাজার আদেশ বহাল রাখেন উচ্চ আদালত। ওই রায়ের ৬৬ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়।

হাজী সেলিমের সাজা বহাল প্রসঙ্গে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, দুর্নীতির এই মামলায় বিচারিক আদালতে দুদকের পক্ষে ২০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। সেসব সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে প্রতীয়মান হয়েছে যে দুদক তার মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য দ্বারা আসামির বিরুদ্ধে ২৭(১) ধারায় আনীত অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। সেজন্য দুদক আইনের ওই ধারায় আসামিকে ১০ বছরের সাজা প্রদান যথাযথ ও আইনসঙ্গত হয়েছে।

রায় প্রকাশের পর দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, রায়ে অনেকগুলো পর্যবেক্ষণ-দিকনির্দেশনা রয়েছে। রায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও কঠোর হতে বলেছেন আদালত। তবে এই রায়ের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হচ্ছে, কমিশন এতে একটি দিকনির্দেশনা পেয়েছে। রায়ের এই পর্যবেক্ষণের আলোকে কমিশন কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। রায়ে বলা হয়েছে, কেউ সাংবিধানিক বা অসাংবিধানিক যে পদেই থাকুক না কেন, দুর্নীতি প্রশ্নে কারও ক্ষেত্রেই যেন তারতম্য করা না হয়।

আপিলের প্রক্রিয়া নিয়ে আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, রায়ের নির্দেশনার আলোকে অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করে তাকে জেলে যেতে হবে। জেল থেকে ওকালতনামা ও রায়ের অনুলিপি দিয়ে তিনি নিয়মিত লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করতে পারবেন, জামিন চাইতে পারবেন। আদালত লিভ টু আপিল গ্রহণ করলে তিনি আপিল করতে পারবেন।

এদিকে হাইকোর্টে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় মারা যাওয়ায় এ মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে দণ্ডিত হাজী সেলিমের স্ত্রী গুলশান আরা বেগমের আপিলটি বাতিল করা হয়েছে। জ্ঞাত আয়বহিভর্‚ত সম্পদ অর্জনের দায়ে দÐবিধির ১০৯ ধারায় গুলশান আরা বেগমকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল বিচারিক আদালত।

ফৌজদারি মামলায় এই দণ্ডের কারণে হাজী সেলিমের সংসদ সদস্য পদও এখন ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো আইনপ্রণেতা নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দুই কিংবা ততধিক বছর কারাদণ্ডিতে দণ্ডিত হলে সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবে না এবং মুক্তি পাওয়ার পর পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি আর সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হন না।

এ বিষয়ে আইনজীবী খুরশীদ আলম খানের ভাষ্য, ‘উনি আর সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না। এটা সাংবিধানিক বিধিবিধান। আপিল বিভাগে গিয়ে যদি তিনি বেকসুর খালাস পান, তবে তার সংসদ সদস্য পদ পুনর্বহাল হবে।’

তবে হাজী সেলিমের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, ‘বিচারিক আদালত থেকে কোনো মামলা আপিলে চলে গেলে চলমান হিসেবে ধরা হয়। ফলে হাজী সেলিমের সংসদ সদস্য পদ থাকছে না, তা সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না। যেমন বিচারিক আদালতে কারও ফাঁসির রায় হলেই তা কার্যকর করা যায় না। আপিল নিষ্পত্তি করেই ফাঁসি কার্যকর করতে হয়। হাজী সেলিমের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য।’

২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর হাজী সেলিম ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল রায়ে বিচারিক আদালত দুদক আইনের দুটি ধারায় হাজী সেলিমকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেন। এছাড়া এই অবৈধ সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে তার স্ত্রী গুলশান আরা সহযোগিতা করেছেন- এমন অপরাধে তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। এছাড়া তাদের ২০ লাখ টাকা জরিমানা এবং প্রায় ২৬ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করেন আদালত।

 

এ জাতীয় আরও খবর

৩৫ বছর পর আজ সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

বিদায়ি বক্তব্যে কাঁদলেন মির্জা ফখরুল

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১৪ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার

১২ জেলায় ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা

ময়মনসিংহে এনসিসি ব্যাংকের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন ও বৃক্ষবিতরণ অনুষ্ঠিত

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশকে ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের সভা

জিয়া-খালেদার সমাধিতে বিএনপির নতুন ৪ নেতার শ্রদ্ধা

সমাজের সবাই এগিয়ে এলে বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় পতন

রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করতে চাই: মির্জা ফখরুল