সাবেক বিমান কর্মকর্তার মৃত্যু ঘিরে রহস্য, বন্ধুর ৪ দিনের রিমান্ড
অনলাইন ডেস্ক : বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর চার দিন পেরিয়ে গেলেও ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উত্তরার একটি বারে বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটানো, টঙ্গীর মাজারবস্তি এলাকায় যাওয়া, নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল এবং একাধিক ফোনকল—সবকিছু মিলিয়ে তদন্তে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার তার বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে নৌ পুলিশ।
তাহসিফের বাবা একেএম এনায়েতুল করিমের করা হত্যা ও লাশ গুমের মামলায় শনিবার আদালত এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে শুক্রবার রাতে পিবিআই দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে তাহসিফ উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্তোরাঁ অ্যান্ড বারে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন এক তরুণী। পরে সেখানে যোগ দেন বন্ধু দীপ।
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ ও ওই তরুণী একটি মোটরসাইকেলে করে রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর আরেকটি মোটরসাইকেলে সেখানে আসেন দীপ। পরে তিনজন একসঙ্গে বারের ভেতরে যান। প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থানের পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তারা বেরিয়ে আসেন।
এরপর ওই তরুণীকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন হাজী মাজারবস্তি এলাকার দিকে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তবে সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য এবং পরবর্তী সময়ে কী ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তদন্তকারীদের কাছে দীপের বক্তব্যেও একাধিক অসংগতি ধরা পড়েছে। কখনো তিনি মাজারবস্তি এলাকায় যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন, আবার কখনো সেখানে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। মোটরসাইকেলটির অবস্থান নিয়েও তার বক্তব্যে পরিবর্তন পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে নম্বরপ্লেটবিহীন কালো রঙের সুজুকি জিক্সার এসএফ ১৫০ মোটরসাইকেল। দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর হাজী মাজারবস্তি এলাকা থেকে এটি উদ্ধার করা হয়। মোটরসাইকেলটি তাহসিফ ব্যবহার করতেন কি না, তা নিশ্চিত হতে ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তাহসিফ ও দীপের মধ্যে ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে ১০ থেকে ১২ বার যোগাযোগ হয়েছিল। এ ছাড়া ২৩ জনের মোবাইল ফোনের কললিস্ট, বার্তা ও হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগের তথ্য ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা ওই রাতে তাহসিফ ও দীপের চলাচলের পথ, সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শী এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করছেন। দীপের দাবি অনুযায়ী, তাদের ধাওয়া করা ব্যক্তিরা কারা ছিলেন এবং তাদের পরনে পুলিশের পোশাক ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা ও মরদেহ গুমের অভিযোগে উত্তরখান থানায় মামলা করেছেন তার বাবা এনায়েতুল করিম। তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধারের দুই দিন পর শুক্রবার রাতে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলাটি করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শনিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস শুনানি শেষে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়নি।
আদালতে রিমান্ড শুনানিতে দীপের পক্ষে আইনজীবী মনিরুল ইসলাম ও মুতাসিম বিল্লাহ জামিনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
অন্যদিকে তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দীপের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
তাহসিফের মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের কল্যাণ সংস্থা রাওয়া। শনিবার সংগঠনটির নেতারা উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের করবী ভবনে তাহসিফের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
তবে তাহসিফের মৃত্যু আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তদন্ত ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।











