শরিকদের মান ভাঙাতে কাছে টানছে বিএনপি
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আবারও ঐক্যের রাজনীতিতে ফিরতে উদ্যোগী হয়েছে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আওয়ামী লীগবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে ও নির্বাচনে তারা একসঙ্গে মাঠে ছিল। তবে সরকার গঠিত হওয়ার পর শরিক দলগুলোর মধ্যে পরবর্তী সময়ে যে অসন্তোষ ও অভিমান তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে নতুন করে সংলাপের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। চলতি নভেম্বর বা ডিসেম্বরের শুরুতে শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে আমন্ত্রণপত্র তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় এই মুহূর্তে সুবিধাজনক সময় বের করতে ব্যস্ত দল ও জোটের নীতি নির্ধারকরা।
দলীয় সূত্র বলছে, এবারের উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠক নয়। দীর্ঘ আন্দোলনের মিত্রদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন, পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির অবসান, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সমন্বয় বাড়ানো। বিশেষ করে সরকার গঠনের পর শরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাওয়া, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া এবং মিত্রদের যথাযথ মূল্যায়ন না করার অভিযোগে তৈরি হওয়া ক্ষোভ প্রশমনকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। তবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট কিংবা অন্য কোনো নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে এবারের সংলাপে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা নেই দলটির। দলীয় সূত্রে এ কথা জানা গেছে।
সংলাপে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা, সংবিধান সংশোধন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং জাতীয় সংকটে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর করণীয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা এবং আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় আসতে পারে। এসব বিষয়ে শরিকদের মতামত ও ভবিষ্যৎ করণীয় জানতে চাইবেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ গুরুত্ব পাবে এবারের আলোচনা।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও দলটির লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘শরিক দলগুলো আমাদের সঙ্গে থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। বিএনপি সরকার গঠনের পরও তারা আমাদের সঙ্গে রয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কর্মসূচিতে তাদের নেতাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সঙ্গে বৈঠক হবে।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের মূল কাজ হলো দেশের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর সমাধানে কাজ করা। এসব বিষয় নিয়েই আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সময় ও সুযোগ বুঝে শরিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসা হবে। তাদেরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে, আমাদেরও নিজস্ব পরিকল্পনা আছে। বৈঠকে উভয় পক্ষের পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।’
দলীয় সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া যুগপৎ আন্দোলনে চারটি জোটসহ নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ৪২টি রাজনৈতিক দল সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে কয়েকটি দল ২০০৮ সাল থেকেই বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত। দীর্ঘ আন্দোলনে এসব দলের নেতা-কর্মীরা মামলা, হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলেও প্রত্যাশিত মূল্যায়ন না পাওয়ায় শরিকদের একাংশের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে পুরোনো ২০-দলীয় জোটের শরিকদের তুলনায় যুগপৎ আন্দোলনের নতুন মিত্রদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন ও এনডিএম থেকে একজন করে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। পরে বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী করা হয়। বিপরীতে দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে থাকা কয়েকটি দলের নেতারা এখনো প্রত্যাশিত রাজনৈতিক স্বীকৃতি পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। এ নিয়ে শরিকদের মধ্যে অসন্তোষ ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে।
সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর গত ২০ জুলাই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ও নৈশভোজ করেন তারেক রহমান। ওই বৈঠকে সরকার পরিচালনায় মতামত দেওয়ার সুযোগ, মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব এবং যথাযথ মূল্যায়ন না করার অভিযোগ তোলেন কয়েকজন নেতা। যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়নের আশ্বাস দেওয়া হলেও এর বাস্তবায়ন হয়নি বলে দাবি করেছেন শরিকদের অনেকেই।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বিএনপি ও সরকারের সঙ্গে শরিক দলগুলোর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব অনেক দিন ধরেই চলছে। সরকার গঠনের পর তা আরও বেড়েছে। রাজনৈতিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে ৩১ দফা বাস্তবায়ন ও জুলাই সনদ কার্যকর করা গেলে দেশ ও জনগণের জন্য মঙ্গলজনক হবে। সরকারপ্রধান সংলাপের উদ্যোগ নিলে সেটি ইতিবাচক হবে।
শুধু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করলেই সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, এটি ভাবা ভুল হবে। সামনের কঠিন দিনগুলোতে যেকোনো সময়ই মিত্র ও জোটসঙ্গীদের পাশে পাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তাই সবকিছু গভীরভাবে বিবেচনা করে ও সবাইকে নিয়েই সামনে এগোনো উচিত। আশা করি, বিএনপির নীতি-নির্ধারক মহল বিষয়টি অনুধাবন করবেন।
জাতীয়তাবাদী জোটভুক্ত ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ও সমমনা জোটের আহ্বায়ক ড. এ জেড এম ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, আলোচনার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত তেমন কিছু শুনিনি। ১৭ বছর আন্দোলনে ছিলাম। সরকার যদি মনে করে আমাদের প্রয়োজন, তাহলে যাব।
বিএনপির সূত্র জানায়, সংলাপের আয়োজন ও সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকতে পারেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, বরকতউল্লাহ বুলু এবং সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। বৈঠকের স্থান হিসেবে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা অথবা গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়কে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রতিটি দল থেকে দু-তিনজন করে নেতাকে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ৫০ থেকে ৬০ জন নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। এরই মধ্যে আমন্ত্রণপত্র তৈরির কাজ চলছে।











