মণিপুরি ভাষা: বাইরে অচল, ঘরে সচল

news-image

সিলেট প্রতিনিধি : সিলেট নগরীর লালাদীঘিরপাড় মণিপুরি পাড়ার বাসিন্দা নোংপকলৈ সিনহা। একদিন কয়েকজন বন্ধু তার বাসায় গেলেন। তখন নোংপকলৈ তার মাকে ডেকে বললেন, ‘ইমা, এইগি ইমানবি লাকলি। চা, ঙমোক শেমবিরউ।’ প্রত্ত্যুত্তরে তার মা শান্তি রাণী দেবী বললেন, ‘শেমলক্কে। চা কাপ কয়া শেমদোরিমো? মি কয়া লাকলিবনো?’

তাদের কথোপকথন শুনে নোংপকলৈ সিনহার বন্ধুরা একে অন্যের দিকে তাকালেন। কারণ তারা মণিপুরি ভাষায় এই কথোপকথনের কিছুই বোঝেননি। তখন এক বন্ধু তাকে আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তাদের কথোপকথনের বিষয়। নোংপকলৈ সিনহা তার বন্ধুদের বলেন, ‘আমি আমার মাকে মণিপুরি ভাষায় বলেছি আমার বন্ধুরা আসছে চা-নাশতা দাও। তখন মা আবার প্রশ্ন করেছেন চা কয় কাপ বানাবেন, কয়জন আসছে।’ নোংপকলৈ সিনহা তাদের নিজস্ব ভাষার চর্চার বিষয়ে খবরের কাগজকে এসব কথা বলেন।

নোংপকলৈ সিনহার মতো সিলেটে বসবাসরত মণিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষজন ঘরে তাদের মাতৃভাষায় কথা বলেন। মণিপুরি ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা ও শিক্ষালাভের সুযোগ খুব একটা না থাকলেও ঘরের অন্য সদস্যদের চর্চার কারণে তাদের পরিবারের শিশু-কিশোররা খুব সহজেই তাদের মাতৃভাষা রপ্ত করে। তবে মণিপুরি সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, বর্তমানে ঘরে চর্চা থাকলেও বাইরে এ ভাষার চর্চা নেই। এ জন্য তাদের ভাষার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বাংলা ও ইংরেজি ভাষার ব্যবহার চলে আসছে।

বাংলাদেশের মধ্যে কেবল সিলেট অঞ্চলে মণিপুরিদের বসবাস। সিলেট বিভাগের চারটি জেলা সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলায় প্রায় ৩০ হাজার মণিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষ স্থায়ীভাবে বাস করেন। তারা সব সময় নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে লালন করেন। তাই দৈনন্দিন জীবনাচারে এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পালনে তারা মণিপুরি ভাষা ব্যবহার করে থাকেন। ভাষার দিক থেকে বাংলাদেশের মণিপুরিরা দুটি শাখায় বিভক্ত- মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া ও মণিপুরি মৈতৈ। মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা ইন্দো-আর্য শ্রেণিভুক্ত আর মণিপুরি মৈতৈ ভাষা তিব্বত-বর্মা শ্রেণিভুক্ত। দুটি আলাদা উৎস থেকে উৎপন্ন হলেও মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া ও মণিপুরি মৈতৈ ভাষা একই সুতোয় গাঁথা।

মণিপুরি মাতৃভাষা বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় ২০১৫ সাল থেকে মণিপুরি ভাষা সংরক্ষণে কাজ করছে এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (একডো)। এই সংস্থা থেকে মণিপুরি ভাষা লেখা, পড়া, শেখানোয় মণিপুরি বর্ণমালাসহ ভাষা শিক্ষার বিভিন্ন বই প্রকাশ হয়। তাদের এই ভাষা শেখার প্রকল্পটি নরওয়ের একটি সংস্থার সহযোগিতায় মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে চলমান আছে। কমলগঞ্জে বর্তমানে তাদের দুটি সেন্টার আছে। মূল স্কুলে যাওয়ার আগে সকালে শিশু-কিশোররা এই সেন্টারগুলোতে মণিপুরি ভাষা লেখে, পড়ে ও শেখে। ২০১৫ থেকে এখন ৫০০ পর্যন্ত মণিপুরি শিশু-কিশোর নিজস্ব বর্ণমালায় লিখতে ও পড়তে শিখেছে এই সংগঠন থেকে।

কথা হয় একডোর নির্বাহী পরিচালক লক্ষ্মীকান্ত সিংহের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা মণিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষজন বাড়িতে মাতৃভাষায় কথা বলি। কিন্তু উঠানের বাইরে গেলেই বাংলা ভাষায় কথা বলি। বর্তমানে আমরা যে বাড়িতে মাতৃভাষায় কথা বলি এর মধ্যেও প্রায় ৭০ শতাংশ বাংলা-ইংরেজি ভাষা চলে আসে। এদিকে দেখা যায়, আমাদের নতুন প্রজন্ম মণিপুরি ভাষা বলতে পারলেও লিখতে-পড়তে পারে না। তাই আমাদের মাতৃভাষা ধীরে ধীরে বিলুপ্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’

বাইরে অচল আর ঘরে সচল রাখার মধ্যেও মণিপুরি মাতৃভাষা নিয়ে আশঙ্কার কারণে একডো থেকে ভাষা শেখার কার্যক্রম শুরু করেন জানিয়ে লক্ষ্মীকান্ত সিংহ আরও বলেন, ‘২০১৫ সাল থেকে আমরা মণিপুরি ভাষা সংরক্ষণ ও চর্চা নিয়ে কাজ করছি। নরওয়ের একটি সংস্থা এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করছে। সরকারি কারিকুলামকে অনুসরণ করে মণিপুরি ভাষায় পাঠ্যক্রম সাজানো হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতও আমরা আমাদের পাঠ্যবইয়ে মণিপুরি ভাষায় অনুবাদ করে দিয়েছি। আমাদের শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংগীত বাংলাভাষায় যে সুরে গাওয়া হয়, সেই সুরে মণিপুরি ভাষায় গাইতে পারে। তবে মণিপুরি ভাষা শিক্ষার এ কার্যক্রমের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে সরকারিভাবে মণিপুরি ভাষাকে জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’

এ জাতীয় আরও খবর

নবীনগরে সাড়ে তিন মাস পর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, গ্রেপ্তার ৬

নবীনগরে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নানকে আইনজীবী সমিতির সংবর্ধনা

ধর্মীয় নেতাকে ফাঁসানোর অভিযোগ, বরখাস্ত পুলিশ কর্মকর্তা

মঙ্গলবার শপথ নিচ্ছেন মির্জা ফয়সল ও এলিজা জামান

২০২৭ সালের সরকারি ছুটির তালিকা অনুমোদন, সাধারণ ছুটি ১৫ দিন

৩৫ হাজার টাকায় সিজার, কয়েক ঘণ্টা পর প্রসূতির মৃত্যু; উধাও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ

১২ হাজার ৫০০ টাকায় শ্রমিকের সংসার চলে কীভাবে? প্রশ্ন সাদিকের

১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ২২৩ টাকা

ভাঙ্গায় দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে কলেজছাত্রসহ নিহত ২

সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে নতুন আইন, মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন

মাঠ দখলে দলবদলের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের পর বিএনপির প্রভাব: নাহিদ

শ্রমিক আন্দোলনে স্কুলছাত্রের মৃত্যুর গুজব, সুস্থ আছে সামি